ভোটের আগে বিনা পয়সায় ৫০০০ পরিযায়ী শ্রমিককে পশ্চিমবঙ্গে ফেরাচ্ছে বিজেপি
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বড়সড় রাজনৈতিক কৌশল বিজেপির। প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরে গুজরাটের সুরাট থেকে বিপুল সংখ্যক বাঙালি ভোটারকে রাজ্যে ফেরাচ্ছে গেরুয়া শিবির। ভোটদানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনা রাজনৈতিক মহলে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সুরাটে বসবাসকারী প্রায় ৫,০০০ বাঙালি ভোটারকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার জন্য ৪টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই পুরো উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে স্থানীয় সংগঠন সুরাট বাঙালি সমাজ। ভোটের নির্দিষ্ট দফা অনুযায়ী ট্রেনগুলির সময়সূচি ঠিক করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা নির্দিষ্ট দিনে নিজেদের কেন্দ্রে পৌঁছে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। যাতায়াতের সমস্ত খরচ বহন করছে দলীয় সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সমাজসংগঠন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর কৌশল নয়, বরং প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। বিশেষ করে সুরাটে বসবাসকারী বাঙালিদের একটি বড় অংশ হিরে শিল্প, গয়না ব্যবসা ও বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা কর্মসূত্রে রাজ্যের বাইরে থাকলেও তাঁদের ভোটাধিকার পশ্চিমবঙ্গেই রয়ে গেছে। ফলে নির্বাচনের সময় তাঁদের উপস্থিতি বিভিন্ন কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এক প্রবীণ সংগঠকের কথায়, “অনেক শ্রমিকই কাজের চাপ, সময়ের অভাব এবং যাতায়াতের উচ্চ খরচের কারণে ভোট দিতে রাজ্যে ফিরতে পারেন না। এই উদ্যোগ তাঁদের জন্য এক বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এতে একদিকে যেমন তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের পথ খুলছে, অন্যদিকে সংগঠনের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও আরও মজবুত হচ্ছে।”
উল্লেখ্য, সুরাট শহরে প্রায় আড়াই লক্ষ বাঙালি বসবাস করেন বলে অনুমান করা হয়। গোটা গুজরাট জুড়েই এই সংখ্যা আরও বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে সংগঠিত করে ভোটে অংশগ্রহণ করানো যে কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে। বিজেপি নেতৃত্বের মতে, এই ৫,০০০ ভোটার সরাসরি ভোট দিলেও তাঁদের সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে তা বহু গুণ বাড়তে পারে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় স্তরে তাঁদের মতামত অন্য ভোটারদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণেই দল এই উদ্যোগকে ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’ হিসেবে দেখছে এবং দাবি করছে, এর ফলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ১০ থেকে ১২ লক্ষ ভোটারের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
সম্প্রতি সুরাটের পুরসভা নির্বাচনে বিজেপির ভালো ফলাফলের পর এই ধরনের সংগঠিত প্রচার আরও জোরদার হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ, যেখানে প্রবাসী ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সুরাটের বাঙালি ব্যবসায়ী ও সংগঠনের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া মিলেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, আগে অর্থনৈতিক কারণে ভোট দিতে যেতে না পারলেও এবার তাঁরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ আবার নিজস্ব খরচেও রাজ্যে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে কর্মরত বাঙালিদের মধ্যে ইতিমধ্যেই এই নিয়ে উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ৫,০০০ ভোটারের সংখ্যা মোট বাঙালি প্রবাসীদের তুলনায় সীমিত হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি ভবিষ্যতে অন্য দলগুলিকেও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করতে পারে। প্রবাসী ভোটারদের সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার এই নতুন ধারা ভারতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এই কৌশল কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটা স্পষ্ট যে, ভোটারদের কাছে পৌঁছতে এবং তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলি ক্রমশ নতুন ও উদ্ভাবনী পন্থা গ্রহণ করছে—আর সেই তালিকায় সুরাট থেকে ভোটার ফেরানোর এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই এক নজির সৃষ্টি করেছে।
তথ্যসূত্র: Bhaskar , The Telegraph


