Sunday, April 19, 2026
Latestদেশ

প্রয়োজনে একে অপরের ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি, আকাশসীমা এবং অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারবে ভারত-রাশিয়া; নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে যখন একের পর এক সংঘাত, যুদ্ধ এবং অস্থিরতা বাড়ছে, ঠিক সেই সময়েই নিজেদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল ভারত ও রাশিয়া। দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চুক্তি এবার আন্তর্জাতিক মহলেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনে যুদ্ধ পরিস্থিতি বা জরুরি অবস্থায় একে অপরের ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি, আকাশসীমা এবং অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারবে ভারত ও রাশিয়া—যা নিঃসন্দেহে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ।

রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ‘তাস’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই চুক্তির আওতায় দুই দেশের সেনাবাহিনী শুধু সামরিক সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি ভাগ করে নেবে তা নয়, বরং প্রয়োজনে একে অপরের মাটিতে অবস্থান করেও অপারেশন পরিচালনা করতে পারবে। যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান বা অন্যান্য সামরিক সম্পদও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ব্যবহার করা যাবে। সম্প্রতি মস্কোর তরফে এই চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলী প্রকাশ করা হয়েছে, যা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সরাসরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর বহুমাত্রিক ব্যবহার। শুধু যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় নয়, শান্তিকালেও এই সহযোগিতা কার্যকর থাকবে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, মানবিক সহায়তা প্রদান, এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও দুই দেশ একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারবে। ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির ফলে দুই দেশের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে এশিয়া এবং ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। ভারত যদি কোনও শত্রু দেশের আক্রমণের মুখে পড়ে, তাহলে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। একইভাবে, রাশিয়াও প্রয়োজনে ভারতের সহায়তা নিতে পারবে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

উল্লেখ্য, এই চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারত সফরে আসেন। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। এই বৈঠকগুলিতেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকের মাধ্যমে এই চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়াও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে যে সমস্ত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে, সেগুলি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রেও ছাড়পত্র দিয়েছে রাশিয়া। এর ফলে ভারত শুধু নিজের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারবে। এটি ভারতের আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রেও একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই ধরনের চুক্তি শুধু দুই দেশের সম্পর্ককে মজবুত করে না, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলে। একদিকে যেমন পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক জটিল, অন্যদিকে ভারত তার কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতারও একটি উদাহরণ।

সব মিলিয়ে, ভারত-রাশিয়া এই সামরিক চুক্তি শুধু প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ভবিষ্যতের যেকোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশ যে একে অপরের পাশে থাকবে, এই চুক্তি সেই আস্থাকেই আরও শক্তিশালী করে তুলল।