৫ বারের চেষ্টায় অবশেষে সাফল্য, UPSC-তে ৩৭তম র্যাঙ্ক, সংগ্রামের গল্পে অনুপ্রেরণা সাক্ষী জৈন
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: স্বপ্ন যদি বড় হয়, তবে তার পথ কখনওই সহজ হয় না—এই বাস্তব সত্যটাকেই নিজের জীবনের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিলেন রাজস্থানের টঙ্কের মেয়ে সাক্ষী জৈন। পাঁচবার ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার পর অবশেষে পঞ্চম প্রচেষ্টায় কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। ৩৭তম র্যাঙ্ক পেয়ে এখন তিনি শুধুমাত্র একজন সফল প্রার্থী নন, বরং লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর কাছে এক বড় অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন।
সাক্ষীর গল্প শুরু হয় একেবারে ভিন্ন দিক থেকে। তিনি পেশায় একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট এবং পড়াশোনা শেষ করে একটি নামী আন্তর্জাতিক সংস্থা, বার্কলেজে আর্থিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। কর্পোরেট জগতের স্থিতিশীল চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা—সব কিছুই ছিল তাঁর নাগালে। কিন্তু মনের ভিতরে ছিল অন্যরকম একটা তাগিদ। শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছাই তাঁকে ভিন্ন পথে হাঁটার সাহস জুগিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এমন একটি পেশা বেছে নিতে চান যেখানে সরাসরি মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই তিনি ইউপিএসসি-র প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন—যা নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।
কোভিডের কঠিন সময়েই শুরু হয় তাঁর এই যাত্রা। যখন গোটা বিশ্ব থমকে গিয়েছিল, তখনই সাক্ষী নিজের লক্ষ্য স্থির করে নেন। বাড়িতে বসেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে পড়াশোনা শুরু করেন। ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বেছে নেন কমার্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেন্সি, যেখানে তাঁর আগেই ভালো দখল ছিল। তবে ইউপিএসসি পরীক্ষার বিস্তৃত সিলেবাস এবং গভীর প্রস্তুতি তাঁকে নতুন করে অনেক কিছু শিখতে বাধ্য করে। প্রথমবার ২০২১ সালে পরীক্ষায় বসেন তিনি, কিন্তু সেই প্রচেষ্টায় সাফল্য পাননি। অনেকের কাছে এই ব্যর্থতা হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াত, কিন্তু সাক্ষী সেটিকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেন।
পরবর্তী বছরগুলোই তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। ২০২২ থেকে ২০২৫—টানা চারবার তিনি প্রিলিমিনারি এবং মেইনস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইন্টারভিউ পর্যন্ত পৌঁছান। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকায় প্রতিবারই স্বপ্ন ভেঙে যায়। এতবার এতদূর এগিয়ে গিয়েও শেষ ধাপে থেমে যাওয়া মানসিকভাবে ভীষণ কঠিন। তবুও এখানেই তাঁর দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি হাল ছাড়েননি, বরং প্রতিবার নিজের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন। নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন।
অবশেষে পঞ্চম প্রচেষ্টায় তিনি নিজের সেরাটা উজাড় করে দেন। ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মতামত তুলে ধরেন এবং সেই পারফরম্যান্সই তাঁকে এনে দেয় সাফল্য। ৩৭তম র্যাঙ্ক অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেন যে ধারাবাহিক পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই।
এই দীর্ঘ প্রস্তুতির সময় শুধু পড়াশোনার চাপই নয়, ব্যক্তিগত এবং শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের প্রভাব পড়েছিল তাঁর শরীরের ওপরও। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি নিয়মিত যোগব্যায়াম করতেন এবং হাঁটাহাঁটি করতেন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, নইলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাক্ষীর স্বপ্ন শুধু একটি উচ্চপদস্থ চাকরি পাওয়া নয়। তিনি বিশেষভাবে মহিলাদের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে চান। তাঁর মতে, সমাজের একটি বড় অংশ এখনও আর্থিক জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে, বিশেষ করে মহিলারা। এই ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান।
ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বার্তাও অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। তিনি মনে করেন, এই পরীক্ষার জন্য অযথা বেশি পড়াশোনা নয়, বরং সঠিকভাবে এবং পরিকল্পনা মাফিক পড়াশোনা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিলেবাস ভালোভাবে বোঝা, আগের বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করা এবং নিয়মিত রিভিশন—এই কয়েকটি বিষয়ই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। পাশাপাশি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাটাও সমান জরুরি।
সব মিলিয়ে, সাক্ষী জৈনের এই যাত্রা শুধুমাত্র একটি সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক জীবন্ত উদাহরণ। বারবার ব্যর্থতা সত্ত্বেও যিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি, শেষ পর্যন্ত তিনিই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন। তাঁর এই গল্প আজকের দিনে প্রতিটি স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।


