তৃণমূলের অভিযোগ খারিজ, ‘যে যা খেতে চান খেতে পারেন’, মাছ-মাংস ইস্যুতে বললেন অনুরাগ ঠাকুর
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: বঙ্গ রাজনীতিতে এবার নতুন করে কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘মাছ-ভাত’ ইস্যু। নির্বাচনের আবহে শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে যখন তীব্র বাকযুদ্ধ চলছে, ঠিক সেই সময় তৃণমূলের তোলা অভিযোগের জবাব দিতে কলকাতায় এসে প্রকাশ্যে মাছ খেলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর (Anurag Thakur)। বিজেপির রাজ্য দফতরে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে বসে তিনি স্বাভাবিকভাবেই মাছ খেয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
গত কয়েকদিন ধরে নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি ধারাবাহিকভাবে বিজেপিকে আক্রমণ করে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে মাছ-ভাত, যা বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তা নিয়েও বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। এই প্রচারকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে পাল্টা কৌশল হিসেবে সামনে আসে বিজেপির এই প্রতীকী পদক্ষেপ। ‘অনুরাগ ঠাকুর’ শুধু বক্তব্য রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সরাসরি মানুষের সামনে মাছ খেয়ে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, বিজেপি মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ বা খাদ্যাভ্যাসে কোনও হস্তক্ষেপ করে না। তাঁর কথায়, দেশের একাধিক রাজ্যে বিজেপির সরকার রয়েছে এবং কোথাও মানুষ কী খাবেন বা কী পরবেন, তা নিয়ে কোনও বাধা নেই।
তিনি আরও বলেন, “ভারত একটি বহুত্ববাদী দেশ, এখানে প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। বিজেপি সেই বৈচিত্র্যকে সম্মান করে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তৃণমূলের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেই তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
তবে এখানেই থেমে থাকেননি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে বলেন, যারা দুর্নীতি করে মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তারাই এখন খাবার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের মানুষের প্রকৃত সমস্যা—চাকরি, উন্নয়ন, দুর্নীতি—এসব থেকে নজর ঘোরাতেই এই ধরনের ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে।
অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য তাদের অবস্থানেই অনড়। তাদের দাবি, বিজেপির বিভিন্ন রাজ্যে গরু সংক্রান্ত আইন বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের নজির রয়েছে। সেই কারণেই তারা বাংলার মানুষকে আগাম সতর্ক করছে। তৃণমূলের মতে, বাংলার সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাস রক্ষা করা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো ঘটনাটি আসলে নির্বাচনী কৌশলেরই অংশ। বাংলায় ‘মাছ-ভাত’ শুধু খাবার নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয়। সেই পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভোটারদের আবেগে প্রভাব ফেলতে চাইছে দুই পক্ষই। তৃণমূল এই ইস্যুকে ব্যবহার করে বিজেপির বিরুদ্ধে ভয় তৈরি করতে চাইছে, অন্যদিকে বিজেপি নিজেদের উদার ও স্বাধীনতার পক্ষে দল হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—এবারের নির্বাচনে শুধু উন্নয়ন বা দুর্নীতির মতো ইস্যুই নয়, বরং সংস্কৃতি, পরিচয় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও বড় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, মাছের থালা ঘিরে যে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা যে শুধুমাত্র প্রতীকী নয়, বরং ভোটের অঙ্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে, তা মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। এখন দেখার, এই ‘মাছ-ভাত’ ইস্যু শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলতে পারে বাংলার নির্বাচনী ফলাফলে।


