Monday, August 10, 2026
Latestকলকাতা

আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরা নিয়ে বামপন্থীদের এত জ্বালা কেন: তসলিমা নাসরিন

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় আসেন তসলিমা নাসরিন। এ বিষয়ে বামপন্থীদের তরফে তুমুল সমালোচনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে লেখিকা ফেসবুকে লিখেছেন, “বাংলাদেশের বামপন্থী তরুণ নেতা মেঘমল্লার বসুকে নিয়ে আমি ফেসবুকে কত লিখেছি! তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছি, তাঁর ওপর মৌলবাদীদের আক্রমণের প্রতিবাদ করেছি, এমনকি একদিন তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখতে চাই বলেছি। সেই মেঘমল্লারই এখন আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন।

প্রাক্তন নকশাল প্রশান্ত রায় সাতাশ বছর ধরে আমার প্রকাশক। শুধু প্রকাশক নন, আপন দাদার মতো, আত্মীয়ের মতো কাছের মানুষ। তিনিও এখন আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গেও আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল। তিনিও বাজে কথা বলছেন।

হঠাৎ কী হলো এঁদের? আমার বিরুদ্ধে এত বিষ কেন? আমার অপরাধটা কী?

উনিশ বছর পর আমি পশ্চিমবঙ্গে ফিরেছি—এটাই অপরাধ? পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন—এটাই অপরাধ? সেক্যুলার মিশনের কর্ণধার ওসমান মল্লিক আমাকে যে মঞ্চে স্বাগত জানিয়েছেন, সেই মঞ্চে উপস্থিত বক্তাদের কেউ বিজেপির সমর্থক, কেউ সরাসরি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত—এটাই অপরাধ?

তাঁরা কিন্তু বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে মঞ্চে ছিলেন না। স্বপন দাশগুপ্ত, তথাগত রায়, মোহিত রায়, শাশ্বতী ঘোষ, বিনায়ক বন্দোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরার পক্ষে কথা বলেছেন, আমার ফেরার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। সেই কারণেই তাঁরা ওই মঞ্চে ছিলেন।

আসলে বামপন্থীদের অস্বস্তির কারণটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ তাঁরা নেননি; উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকটি ছোট নাগরিক সংগঠন। আর আমাকে স্বাগত জানিয়েছে বর্তমান বিজেপি সরকার এবং ডানপন্থীরা। বামপন্থীরা যে কাজটি করেননি, তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরা সেই কাজটি করেছেন। এই সত্যই তাঁদের অসহ্য হয়ে উঠেছে।

একজন ধর্মনিরপেক্ষ নারীবাদী লেখককে বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়েছিল; উনিশ বছর পর সেই লেখককেই স্বাগত জানিয়েছে একটি বিজেপি সরকার। এই রাজনৈতিক বৈপরীত্য তাঁদের আত্মমূর্তিতে আঘাত করেছে। তাই নিজেদের ব্যর্থতার মুখোমুখি না হয়ে তাঁরা আমাকে বিজেপির লোক বানাতে ব্যস্ত।

কিন্তু আমার ভাষণটি নিয়ে তাঁরা একটি কথাও বলছেন না কেন? আমার ভাষণের একটি বাক্য উদ্ধৃত করে দেখান, কোথায় আমি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছি। কোথায় আমি আমার আদর্শ থেকে এক ইঞ্চি সরে গেছি? কোথায় আমি ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর সমানাধিকার, মানববাদ, যুক্তিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেছি?

বামপন্থীরা মঞ্চে বসলে কি আমি কমিউনিস্ট হয়ে যেতাম? তা হলে বিজেপির লোকেরা মঞ্চে বসলে আমি বিজেপি হয়ে গেলাম কী করে?

একই মঞ্চে বসা মানে একই মতাদর্শে দীক্ষা নেওয়া নয়। কারও আমন্ত্রণ গ্রহণ করা মানে তাঁর সব রাজনৈতিক মত গ্রহণ করা নয়। আবারও বলছি, কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়।

কিন্তু আমার বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা না করে তাঁরা মঞ্চের অতিথিদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে আমার পরিচয় নির্ধারণ করছেন। এ যুক্তি নয়, এ গোষ্ঠী-রাজনীতি। তাঁরা আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানোর চেষ্টাও করেননি; অথচ যাঁদের তাঁরা পছন্দ করেন না, তাঁরাই আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বিষোদ্গারের আসল কারণ সম্ভবত এটিই।

বামফ্রন্ট সরকার আমাকে আমার প্রিয় শহর থেকে তাড়িয়েছিল। যে কলকাতাকে ভালোবেসে ইউরোপ-আমেরিকার জীবন ছেড়ে আমি বাস করতে এসেছিলাম, সেই কলকাতা থেকে আমাকে রাতারাতি নির্বাসিত করা হয়েছিল। তারপর কেটে গেল উনিশ বছর। আমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বামপন্থীরা কী করেছিলেন? ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন? ক্ষমতা হারানোর পর কোনও নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন? কোনও সভা, মিছিল, আবেদন বা প্রতিবাদ করেছিলেন? একবারও কি বলেছিলেন—একজন বাঙালি লেখকের বাংলায় বাস করার, নিজের প্রিয় শহরে ফেরার অধিকার আছে?

না, কিছুই করেননি।

সম্ভবত তাঁরা চেয়েছিলেন, আমাকে যে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আমি সেখানেই নিঃশব্দে পড়ে থাকি। বিস্মৃত হই। আমার কণ্ঠ মানুষের কাছে আর না পৌঁছোক। তাঁরা আমাকে ফিরিয়ে আনবেন না, অন্য কেউ ফিরিয়ে আনলে সেটিও সহ্য করবেন না—এ কেমন রাজনীতি?

আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কোনও সরকার, কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও বিশাল সংগঠন নেয়নি। উদ্যোগ নিয়েছিল ছোট একটি সংগঠন—সেক্যুলার মিশন। পরে যুক্ত হয়েছিল আরও দুটি ছোট সংগঠন—‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ এবং হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন। অধিকাংশ মানুষ হয়তো আগে এদের নামও শোনেননি। কিন্তু বড় বড় রাজনৈতিক দল এবং বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যে কাজ উনিশ বছরে করতে পারেনি—বস্তুত করার চেষ্টাও করেনি—এই ছোট সংগঠনগুলো সেই বন্ধ দরজা খুলেছে।

আর সেই নাগরিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বর্তমান বিজেপি সরকার। সরকার আমাকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়েছে। ডানপন্থীরা প্রকাশ্যে আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। এই সত্য স্বীকার করতে আমার কোনও অসুবিধা নেই। সত্য স্বীকার করলেই কেউ ডানপন্থী হয়ে যায় না।

বিপ্লব সব সময় বড় দলের পতাকা নিয়ে আসে না; কখনও কয়েকজন সাহসী মানুষই বিপ্লব ঘটান।

সেই মঞ্চে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল; আমন্ত্রণপত্রেও তাঁর নাম ছিল। বয়সজনিত কারণে তিনি আসতে পারেননি, কিন্তু ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন। তাঁর বার্তা তাঁর উদারতা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত। আমি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডেকেছিলাম; তিনিও বিজেপির সমর্থক নন। তা হলে নাগরিক সংবর্ধনার অনুষ্ঠানটি কী করে বিজেপির অনুষ্ঠান হয়ে গেল?

আমার সঙ্গে মঞ্চের প্রত্যেক বক্তার সব বিষয়ে মতের মিল ছিল—এমন নয়; থাকার প্রয়োজনও নেই। মঞ্চটি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ বিতরণের মঞ্চ ছিল না। সেটি ছিল উনিশ বছর পর একজন লেখকের নিজের প্রিয় শহরে ফেরার নাগরিক অনুষ্ঠান।

বামপন্থীরা চাইলে অনুষ্ঠানে আসতে পারতেন। আমার ভাষণ ও কবিতা শুনতে পারতেন। আমার সঙ্গে দ্বিমত করতে পারতেন, প্রশ্ন তুলতে পারতেন, তর্ক করতে পারতেন। সেটাই হতো গণতান্ত্রিক আচরণ। কিন্তু তাঁরা আমাকে বয়কট করলেন, তারপর দূরে বসে কুৎসা রটালেন। একে মতাদর্শের দৃঢ়তা বলে না; বলে গোষ্ঠী-অহংকার এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা।

এ অবশ্য নতুন নয়। ‘লজ্জা’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে—তেত্রিশ বছর আগে। সেই তেত্রিশ বছর ধরেই বামপন্থী মহলের একটি বড় অংশ আমার সঙ্গে এই আচরণ করছে। হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমি কথা বললে তাঁদের আপত্তি নেই; ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে একই দৃঢ়তায় কথা বললেই তাঁরা অস্বস্তিতে পড়েন। মুসলিম মৌলবাদীরা যত অন্যায়ই করুক, যত নারী নির্যাতন করুক, যত মুক্তচিন্তকের মাথার দাম ঘোষণা করুক, তাদের সমালোচনা করলে বামপন্থীদের একাংশ সহ্য করতে পারেন না।

মুসলিম নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা আর ইসলামি মৌলবাদকে রক্ষা করা এক জিনিস নয়। প্রথমটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব; দ্বিতীয়টি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ। যে ধর্মনিরপেক্ষতা এক চোখ দিয়ে হিন্দু মৌলবাদ দেখে, অন্য চোখ দিয়ে ইসলামি মৌলবাদ দেখেও না দেখার ভান করে—সেটি ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।

আজ অশিক্ষিত জিহাদিরা আমার বিরুদ্ধে যে ভাষায় অপপ্রচার চালাচ্ছে, শিক্ষিত বামপন্থীদের একাংশও প্রায় একই ভাষায় একই বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। আমি বলছি না, জিহাদি আর বামপন্থী একই মতাদর্শের মানুষ। কিন্তু একজন ধর্মনিরপেক্ষ নারীবাদী লেখককে আক্রমণ করতে গিয়ে যখন দুই পক্ষ একই মিথ্যা, একই কুৎসা এবং একই ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করে, তখন তাদের ভাষার মধ্যে নৈতিক পার্থক্যটি কোথায় থাকে?

অশিক্ষিত মৌলবাদীর অন্ধতা দুর্ভাগ্যজনক; শিক্ষিত প্রগতিশীলের সচেতন অসততা আরও লজ্জাজনক।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা বামপন্থীরা নিজেদেরই করছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, একজন নির্বাসিত লেখকের পশ্চিমবঙ্গে ফেরার অধিকারের পক্ষে যে জায়গাটিতে সবার আগে বামপন্থীদের দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেই জায়গাটি তাঁরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ডানপন্থীরা সেই জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

সত্যিটা হলো, এবার ডানপন্থীরা আমার ফেরার অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বামপন্থীরা দাঁড়াননি। এখন এই অবস্থানের জন্য ডানপন্থীরা যদি কৃতিত্ব পান, বামপন্থীরা আমাকে দোষ দিচ্ছেন কেন? এই জায়গাটি ডানপন্থীদের হাতে তুলে দিলেন কারা? বামপন্থীরা নিজেরাই।

আমি কোনও রাজনৈতিক শিবিরের নই। কেউ আমার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করলে তাঁকে ধন্যবাদ দেব; অন্যায় করলে তাঁর সমালোচনাও করব। বিজেপি সরকারের স্বাগত আমার আনুগত্য কিনে নেয়নি। সরকারের দেওয়া নিরাপত্তা আমার কণ্ঠ রুদ্ধ করেনি। কোনও মঞ্চ, কোনও অতিথি, কোনও রাজনৈতিক দল আমার আদর্শ নির্ধারণ করে না। আমার কণ্ঠ আমারই।

আমি পশ্চিমবঙ্গে ফিরেছি মাথা নত করে নয়, নিজের বিশ্বাস আরও দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করতে। কলকাতার সাধারণ মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার কাছে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের অনুমোদনের সিলমোহর নিতান্তই তুচ্ছ।

না, লজ্জা আমার নয়। লজ্জা তাঁদের—যাঁরা আমাকে তাড়িয়েছিলেন, উনিশ বছর নীরব ছিলেন, আমাকে ফিরিয়ে আনার কোনও চেষ্টা করেননি, আর আজ তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে আমার বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গ কোনও রাজনৈতিক দলের জমিদারি নয়। কলকাতাও নয়। পশ্চিমবঙ্গ মানুষের, কলকাতা মানুষের। সেই মানুষের ভালোবাসায় আমি ফিরেছি। আবারও ফিরব।