Monday, June 24, 2024
সম্পাদকীয়

সংস্কৃত অভিধানে দুর্গা

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: সংস্কৃত ভাষার একটি প্রাচীন অভিধান ‘অমরকোষ’। এ অমরকোষ গ্রন্থে দেবীদুর্গার ১৭ টি নাম উক্ত হয়েছে। দুই তিনটি বাদে দেবীদুর্গার এ ১৭ টি নামের অধিকাংশ নামই বেদের সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আচরণ্যক এবং উপনিষদে পাওয়া যায়।

উমা কাত্যায়নী গৌরী কালী হৈমবতীশ্বরা। 

শিবা ভবানী রুদ্রাণী শৰ্ব্বাণী সৰ্বমঙ্গলা। 

অপর্ণা পাৰ্বতী দুর্গা মুড়ানী চণ্ডিকাম্বিকা ৷৷

[আৰ্য্যা দাক্ষায়ণী চৈব গিরিজা মেনকাত্মজা ।]

(অমরকোষ:প্রথম কাণ্ড, স্বর্গবর্গ, ২৮)

“দুর্গাবাচক শব্দ হল— উমা, কাত্যায়নী, গৌরী, কালী, হৈমবতী, ঈশ্বরা, শিবা, ভবানী, রুদ্রাণী, শর্বাণী, সৰ্বমঙ্গলা, অপর্ণা, পাৰ্বতী, দুৰ্গা, মৃড়ানী, চণ্ডিকা, অম্বিকা, (স্ত্রী)।”

অমরকোষে ১৭ নাম পরেও, অতিরিক্ত আরও চারটি নাম পাওয়া যায়, আর্যা, দাক্ষায়নী, গিরিজা এবং মেনকাত্মজা। উমা, কাত্যায়নী, গৌরী, কালী, হৈমবতী, ঈশ্বরা, শিবা, ভবানী, রুদ্রাণী, শর্বাণী, সৰ্বমঙ্গলা, অপর্ণা, পাৰ্বতী, দুৰ্গা, মৃড়ানী, চণ্ডিকা, অম্বিকা এ নামগুলো যে সকলেই একই আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গারই নাম এ বিষয়টি আমরা এই অমরকোষেও দেখতে পাই। অর্থাৎ যিনি গৌরী, তিনিই কালী, আবার তিনিই দুর্গা।

‘শব্দকল্পদ্রুম’-অভিধানে আদ্যাশক্তি মহামায়া দেবী দুর্গা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, অযোনিসম্ভবা দেবী ‘দুর্গম্’ নামক অসুরকে বধ ক’রে দুর্গতিনাশিনী দুর্গারূপে পরিচিত হন। বিশ্ববাসীর মহাভয় এবং দুর্গতি বিনাশ করেন বলেই তাঁর ‘দুর্গা’-নামের সার্থকতা। অজ্ঞান ও সংসারবন্ধন জীবের অন্যতম দুর্গতি।

দুর্গো দৈত্যে মহাবিঘ্নে ভববন্ধে কুকর্মণি।

 শোকে-দুঃখে চ নরকে যমদণ্ডে চ জন্মনি ৷৷  

মহাভয়েঽতি রোগে চাপ্যাশব্দো হন্তৃবাচকঃ। 

এতান্ হন্ত্যেব যা দেবী সা দুর্গা পরিকীর্তিতা৷৷

“দুর্গা শব্দে ‘দুর্গ’ শব্দে দৈত্য, মহাবিঘ্ন, ভববন্ধন, কুকর্ম, শোক, দুঃখ, নরক, যমদণ্ড পুনর্জন্ম, মহাভয়,অতিরোগ বোঝায়। ‘আ’ শব্দের অর্থ হন্তা, অর্থাৎ যিনি বিনাশ করেন। তাই যিনি এই সকল বিবিধ প্রকারের মহাবিঘ্ন বিনাশ করেন, তিনিই দেবী দুর্গা নামে প্রকীৰ্তিতা।”

দুর্গা শব্দের অর্থ দুর্গতিহারিনী জননী। শব্দকল্পদ্রুম অভিধানে আরও বলা হয়েছে, ‘দুর্গা’ শব্দের ‘দ’ অক্ষরটি দৈত্য এবং অসুর বিনাশ করে, উ-কার বিঘ্ন নাশ করে, “রেফ” রোগ এবং মহাভয় বিনাশ করে, ‘গ’ অক্ষরটি পাপ নাশ করে অর্থাৎ সংস্কার মুক্ত করে এবং আ-কার শত্রু নাশ করে। এর অর্থ, দৈত্য,অসুর, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, মহাভয়,ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। এবং দুর্গা নামটি সর্বৈব ভাবে বেদসম্মত। বেদেই দুর্গামাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। 

দৈত্যনাশার্থ বচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ। 

উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদ-সম্মতঃ।। 

রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ। 

ভয় শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিতঃ।। 

স্মৃত্যুক্তিশ্রবনাদ্ যস্যা এতে নশ্যন্তি নিশ্চিতম্। 

ততো দুর্গা হরেঃ শক্তির্হরিণা পরিকীর্তিতা।।

দুর্গেতি দৈত্যবচনো ঽপ্যাকারো নাশবাচকঃ।

দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা।। বিপত্তিবাচকো দুর্গশ্চাকারো নাশবাচকঃ। 

তং ননাশ পুরা তেন বুর্ধৈদুর্গা প্রকীর্তিতা৷৷ 

” দুর্গা শব্দের ‘দ’ বৰ্ণ দৈত্যনাশক, ‘উ’ বিঘ্ননাশক, রেফ রোগ নাশক, ‘গ’ পাপনাশক ‘আ’ কার ভয় ও শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয় নাশ বাচক। অথবা ‘দুর্গ’ শব্দটি দৈত্য বাচক এবং ‘আ’ কার নাশবাচক। “দুর্গ” নামক অসুরকে যিনি নাশ করেন তিনিই নিত্য ‘দুর্গা’ নামে প্রকীৰ্ত্তিতা। অথবা ‘দুর্গ’ শব্দটি বিপত্তিবাচক, ‘আ’কার নাশবাচক। যিনি বিপত্তারিনী তাকে জ্ঞানীজনেরা দুর্গা’ নামে অভিহিত করেন।”

দুর্গম নামক মহাসুরকে বধ করে, তিনি ‘দুর্গা’ নামে খ্যাতা। দুর্গম শব্দের পৌরাণিক অর্থ দৈত্য বা অসুর। কিন্তু এর আরও একটি আধ্যাত্মিক নিগুঢ় অর্থ রয়েছে। তা হলো, জন্ম-মৃত্যুর আবর্তন চক্রে অজ্ঞানের দুর্গ থেকে যে করুণাময়ী দেবী জীবকে রক্ষা করে, আত্মোপলব্ধির দুর্গম পথ সুগম করে দেন, তিনিই দুর্গা। তিনি নাম রূপ উপাধিহীন পরমসত্ত্বা। তিনি সগুনা নির্গুণা উভয়ই l তিনিই জীবের একমাত্র অন্তিমগতি এবং মুক্তিপ্রদাত্রী। অন্তিমকালে তিনিই তাঁর অভয়পদে জীবকে আশ্রয় প্রদান করেন।

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

হকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়