Friday, June 14, 2024
সম্পাদকীয়

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জোর দাবি জানান

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন একজন বিখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি সর্বপ্রথম পাকিস্তান পার্লামেন্টের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বক্তব্য রেখেছিলেন কিন্তু তার সেদিনের অবদানের কথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ এর জনগণ ভুলে গেলেও পাকিস্তানি সেনারা ঠিকই তাকে মনে রেখেছিল। তাই তাকে ১৯৭১ সালে পাক সেনাবাহিনী নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে।

সংগ্রাম দত্ত:

শহীদ এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। একজন বিখ্যাত আইনজীবী। তিনি গরীবের মামলা বিনা পয়সায় চালিয়েছেন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা, বৃটিশ ভারতের পার্লামেন্ট মেম্বার,পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি,একজন সমাজসেবক, পাকিস্তান আইনসভায় সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপনকারী। পুর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর ঘনিষ্ট বন্ধু,১৯৭১ সালে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তান মিলিটারী এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ব্যাপক নির্যাতন চালায়। তাঁর দুই হাটু ভেঙ্গে ফেলে,দুই চোখ উপড়ে ফেলে। নির্যাতনের পরে হত্যা করা হয়। বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেও ” একুশে পদক” থেকে বঞ্চিত।

১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের তিন মাইল উত্তরে রামরাইল গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। শৈশবেই মাতৃহারা হন। তাঁর বাবা ছিলেন মুনসেফ কোর্টের সেরেস্তাদার জগবন্ধু দত্ত। 

১৯০৪ সালে নবীনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন।

 ১৯০৬ সালে কুমিল্লা কলেজ হতে প্রথম বিভাগে এফএ পরীক্ষা পাস করেন। 

১৯০৬ সালে কলকাতায় চলে যান। কলকাতার রিপন কলেজে বি এ ভর্তি হন।এরপর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাত হয়।  

 ১৯০৬ সালের ৭ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার পুর্বধইর গ্রামের কৃষ্ণকমল দাশমুন্সীর মেয়ে সুরবালা দাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

 ১৯০৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কলকাতার রিপন কলেজ হতে প্রথম শ্রেণিতে বিএ পরীক্ষায় পাশ করেন।

১৯১০ সালে কলকাতা রিপন কলেজ প্রথম স্থান অধিকার করে আইন পাস করেন। এরপর কুমিল্লার মুরাদনগর বাঙ্গুরা উমালোচন হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে তাঁর প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯১১ সালে তাঁর প্রথম সন্তান আশালতা দত্ত জন্ম গ্রহন করেন। 

১৯১১ সালে কুমিল্লা বারে আইন পেশায় যোগ দেন। 

১৯১৯ সালে পুত্র সঞ্জীব দত্তের জন্ম হয় । 

১৯১৯ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্বদেশী আন্দোলনের নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির সংস্পর্শে আসেন। ব্যারিষ্টার আবদুর রসুলের সাথেও ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয়। 

১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহন করলে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। মহাত্ম গান্ধীজীর একান্ত অনুসারী হয়ে যান।

 ১৯২৬ সালে তাঁর কনিষ্ঠপুত্র দীলিপ দত্তের জন্ম হয়।

১৯৩০ সালের ২ জুলাই কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহেরুর গ্রেফতারের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করলে কুমিল্লায় এক সমাবেশ থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করা হয় । অক্টোবর মাসে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পন্ডিত জওহর লাল নেহেরুর সাথে সাক্ষাত ঘটে। এরপর জওহর লাল নেহেরুর সাথে তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে যায়। জওহর লাল নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে” কাকা” বলে ডাকতেন।

১৯৩২ সালের ৯ জানুয়ারি এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে বৃটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরন করেন।

১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। 

১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। সভ্য নির্বাচিত হয়ে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনী আইন পাশের সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যুক্ত হন।

১৯৪০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিরোধী প্রচারণা করলে কারাবরণ করেন।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগদান করলে এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিনাশ্রম ও সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেন। 

১৯৪৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। 

 ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস দলের টিকিটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হলে এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একজন অসাস্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ হিসেবে সমগ্র পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবার নজড় কাড়েন।

এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সমগ্র পাকিস্তানের কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং এডভোকেট মনোরঞ্জন ধর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৮ সালের ২৪ জানুয়ারি এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। গণপরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, “দেশের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ নাগরিকের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তা হলে আপনিই বলুন মহাশয়, রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত?… একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা তো সেই ভাষাই হওয়া উচিত, যাতে বেশির ভাগ মানুষ কথা বলেন।” সে দিন তাঁকে সমর্থন করেছিলেন কেবল তিন জন প্রতিনিধি। তফসিল জাতি ফেডারেশনের প্রেমহরি বর্মন, কংগ্রেসের ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং কংগ্রেসের শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কংগ্রেসের রাজকুমার চক্রবর্তী এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন বক্তৃতা দিয়েছিলেন গণপরিষদের অধিবেশনে। কংগ্রেসের রাজকুমার চক্রবর্তীও বলেন, “উর্দু পাকিস্তানের পাঁচ প্রদেশের কোনওটিরই কথ্য ভাষা নয়। বাংলাকে আমরা দুই অংশের সাধারণ ভাষা করার জন্যে চাপ দিচ্ছি না। শুধু চাই ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে সেদিন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটির ওপর দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল এবং প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় গণপরিষদে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। পাকিস্তানের তত্‍কালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান প্রস্তাবটির বিরোধিতাই করেননি। প্রস্তাবকারী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আদর্শ ও সততাকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের জনগনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই উদ্দেশ্য।’ 

এই প্রস্তাবের বিরোধিতা কেবল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী করেননি, বিরোধীতা করেছিলেন পূর্ব বাংলার গণপরিষদের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। খাজা নাজিমুদ্দিন প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ হচ্ছে মুসলমান।কাজেই মুসললমাদের মনোভাব হচ্ছে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। 

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের কায়েদী আজম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহর উপস্থিতিতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। 

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকাসহ সারাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ধর্মঘট পালন করা হয়েছিল। সেদিন ছাত্র জনতার উপর পুলিশ নির্যাতন করেছিল। ফলে পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য হন। চুক্তিতে আসন্ন অধিবেশনে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে এমন শর্ত ছিল। 

১৯৪৯ সালের ১২ আগষ্ট এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী সুরবালার মৃত্যুবরন করেন।

১৯৫২ সালে পাকিস্তান সংসদে মহান বাংলা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জোর সমর্থন দেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। 

১৯৫৬ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ অনুরোধে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হন। 

১৯৫৮ সালে কলেরা ও গুটি বসন্তে পুর্ব পাকিস্তানে বহু লোক মৃত্যুবরন করেন। পুর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ” “দেশপ্রেমিক স্বাস্থরক্ষা অভিযান” কমিটি গঠন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সভাপতি, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের সচিব হাম্মদ রাজা ভাইস চেয়ারম্যান, ডাঃ টি আলী সাধারন সম্পাদক হন। এই কমিটি মাত্র সতের হাজার টাকা ব্যয়ে ঢাকা শহরকে কলেরা ও বসন্তের হাত থেকে রক্ষা করেন। কলেরা ও গুটি বসন্ত নিয়ন্ত্রন করে এডভোকেট ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত দেশ প্রেমিক রাজনীতিতে পরিনত হন।

 ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। 

 ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ” ইলেক্টিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশ অর্ডার (এবডো) আইন প্রয়োগ করেন। এবডো আইন প্রয়োগ করে পুর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ ৪২ জন রাজনীতিবিদকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে দেন।

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদ হলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন, মৌলভি তমিজউদ্দিন খান। 

১৯৬৪ সালে ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনী প্রচার সমর্থন করায় গ্রেফতার হন। 

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান- ভারত যুদ্ধ শুরু হকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান গৃহবন্দি করে রাখেন। 

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষ হবার পরেই এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ বাঙালীর উপর। কুমিল্লা শহরকে শ্মশানে পরিণত হয়। 

১৯৭১ সালে সীমান্ত পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল এডভোকেট ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু দেশের মানুষের কথা ভেবে ভারতে চলে যাননি।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ব্লাড প্রেশারের মাত্রা ভয়ানক রকম বেড়ে যায়। পুত্রবধূ, ছোট ছেলে দীলিপ দত্ত ও নাতনি আরমা দত্তকে ডেকে আনলেন,বললেন ‘সময় খুবই কম।ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বললেন,কুমিল্লা থেকে যদি চলে যাই তাহলে পাকিস্তানের মিলিটারিরা আমাকে খুঁজে না পেয়ে আশপাশের সব লোকজনকে মেরে ফেলবে, আগুন দিয়ে বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেবে। আমাকে না পেলে নিরপরাধ মানুষগুলির প্রাণ যাবে। সেটা তো হতে পারে না। আই অ্যাম ট্রাপড। পাকিস্তানী মিলিটারিরা দুটো জিনিস করতে পারে, আমাকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে গিয়ে আমাকে দিয়ে বিবৃতি দেয়ায় চেষ্টা করবে। যদি করে তাহলে আমি একটা কথাই বলবো-To stop kill these unarmed people, তখন পাকিস্তানী মিলিটারী আমার ওপর অত্যাচার করবে এবং মেরে ফেলবে। 

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ দুপুরে কুমিল্লা শহরে কারফিউ তুলে নেয়া হয়। কুমিল্লা শহরের আশপাশের লোকজন আসতে শুরু করল ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাসায় পরিস্থিতি জানার জন্য।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিকেল ৪টায় আবার কারফিউ শুরু হলে কুমিল্লা শহরে নেমে আসে নীরবতা। সন্ধ্যার দিকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রক্তের চাপ আবার বেড়ে যাওয়ায় কয়েকবার ঠাণ্ডা জল দিয়ে মাথা ধুয়ে নেন। নাতনি আরমা দত্তকে ডেকে গীতা বই আনতে বললেন এবং গীতার একটা স্তবক কয়েকবার পড়ে শোনালেন।দেশের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিলে সে মরে না, সে শহীদ হয় এবং সে অবিনশ্বর।’ সবাই অবাক হয়ে তাঁর গীতা পাঠ শুনছিলেন। সবার মধ্যে একটা চাপা ভয় সেদিন চলে এসেছিল। গীতা পাঠ শেষে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সবার উদ্দেশে আবার বললেন, ‘ওরা আজ রাতে আমাকে নিতে আসবে, যা বলেছি তাই করার চেষ্টা করবে। তোমরা কেউ কাঁদবে না।’ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুয়ে পড়লেন। ছোট ছেলে দীলিপ দত্ত ঘরেই থাকতেন। আরেক ঘরে শুয়েছিলেন আরমা দত্ত, তাঁর মা ও ছোট ভাই রাহুল। কারো চোখেই ঘুম নেই সে রাতে। 

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তান মিলিটারী ও কুমিল্লার কুখ্যাত রাজাকার ও কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এডভোকেট আব্দুল করিমের সহায়তায় এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলীপ দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার অপরাধে তাঁর উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। হানাদার বাহিনী তাঁর দুই হাঁটু ভেঙে দেয় এবং দুই চোখ উপড়ে ফেলে। পানি খেতে দেয় নাই। পাকিস্তানী মিলিটারী পস্রাব খেতে দিয়েছে। টয়লেটের মেঝেতে ফেলে রেখেছে। কি নির্মম অত্যাচার হয়েছ? যারা নির্যাতন দেখেছেন, চোখের জল ফেলেছেন। 

এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কী অমানবিক অত্যাচার চালানাে হয়েছিল, তার বিবরণ রমণী শীল দিয়েছিলেন। ধীরেন বাবু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রমণী শীলের চোখের জল বাঁধন মানেনি। ‘আমার সে পাপের ক্ষমা নেই। ধীরেন বাবু স্কুলঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোথায় প্রস্রাব করবেন। আমি আঙুল দিয়ে ইশারায় তাকে প্রস্রাবের জায়গা দেখিয়ে দিই। তখন তিনি অতি কষ্টে আস্তে আস্তে হাতে একটি পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। তখন ঐ বারান্দায় বসে আমি এক পাকিস্তানী জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। আমি বার বার ধীরেন বাবুর দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলাম বলে পাকিস্তানী জল্লাদ উর্দুতে বলে, “এটা একটা দেখার জিনিস নয়, নিজের কাজ কর।” এরপর বাবুর দিকে আর তাকাবার সাহস পাইনি। মনে মনে শুধু ভেবেছি, বাবু জনগণের বিশাল নেতা ছিলেন, আর আজ তার কপালে এই দুর্ভোগ। তার ক্ষতবিক্ষত সমস্ত দেহে তুলা লাগানো, মাথায় ব্যান্ডেজ, দুটো চোখ নেই, দুই হাটু ভেঙ্গে ফেলেছে ও হাত বাঁধা অবস্থায় উপর্যুপরি কয়েকদিনই ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখেছি।

পিতা ও ছেলেকে কুমিলা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানী মিলিটারী হত্যা করল। লাশের কোন হদিস নেই। 

১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল ভারতের বেতারেই সর্ব প্রথম এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের শহীদ হবার খবর প্রচারিত হয়। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ভারতীয় লোকসভা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাষ্টপতি ভিভি গিরি,প্রনব মুখার্জী,ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেন। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এই বীর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দেখে যেতে পারেননি তাঁর রক্তের উপরে জন্ম নেয়া স্বাধীন বাংলাদেশকে।

ব্রাক্ষনবাড়ীয়ার গ্রামের বাড়ীঘর সম্পত্তি ও কুমিল্লা শহরের বাসা এখনো ” অর্পিত সম্পত্তি ” রয়ে আছে। 

ভাষা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন মাটি ও মানুষের খাটি নেতা। বৃটিশ আমল থেকে দেশের জন্য কাজ করেছেন নিরলসভাবে। হয়েছেন জননন্দিত নেতা। দেশভাগের পরও মাতৃভূমি ত্যাগ করেননি, বরং লড়াই করেছেন দেশবাসীর অধিকার আদায়ের জন্য। নিজ জন্মভুমি কুমিল্লার মাটিকে আকড়ে ধরে রেখেছিলেন।

১৯৯৭ সালে এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ” স্বাধীনতা পুরষ্কার” দেয়া হয়েছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম ” শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল” নামকরন করা হয়েছে। 

কুমিল্লা শহরে ” শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ সড়ক” নামকরন করা হয়েছে।

ব্রাক্ষনবাড়ীয়া জেলায় রামরাইলে নিজ জন্মভুমিতে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় আছে।

বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কোন জীবনী আজো অন্তভুক্ত করা হয়নি। 

 কুমিল্লা শহরের বাসাটি ” যাদুঘর” করার প্রস্তাব করা হলেও বাস্তবায়িত হয়নি। 

কুমিল্লা জনগনের পক্ষ থেকে ” শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিশ্ববিদ্যালয় ” করার প্রস্তাব উপস্থাপিত হলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখছেন না।

রাষ্টীয়ভাবে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত খুবই অবহেলিত।