‘কোনও VVIP-র গাড়িতে তল্লাশির ঘটনা ঘটেনি’, মমতার অভিযোগ খারিজ করলেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ভোটের আগে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। বুধবার ইসলামপুরের জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) দাবি করেন, ‘দমদম বিমানবন্দরে তাঁর গাড়ির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনী এসে পৌঁছেছিল এবং পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছিল যে তাঁর গাড়িতে তল্লাশি চালানো হতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই তল্লাশি আর করা হয়নি।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ‘তিনি নিজেই জওয়ানদের গাড়ি তল্লাশি করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু তা হয়নি।’
মুখ্যমন্ত্রীর এই বিস্ফোরক দাবির পরই রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়ায়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই এই অভিযোগ খারিজ করে দেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরয়াল (Manoj Kumar Agarwal)। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘কোনও ভিভিআইপি-র গাড়িতে তল্লাশি চালানোর মতো ঘটনা ঘটেনি এবং তাঁর কাছে এ ধরনের কোনও তথ্যও নেই।’
বুধবার কলকাতায় নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিকরা—ডিজি, সিপি, মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিব। ওই বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিইও বলেন, “বৈঠকে উপস্থিত কোনও আধিকারিকই ভিভিআইপি-র গাড়ি তল্লাশির কথা জানাননি। এমন কিছু ঘটলে অবশ্যই আমাদের কাছে রিপোর্ট আসতো।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে জানান, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিজস্বভাবে কোনও গাড়ি তল্লাশি করার অধিকার নেই। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি ও অনুমতি ছাড়া এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী শুধুমাত্র সেই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।’
অন্যদিকে, এই ইস্যুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে তৃণমূলের অভিযোগ। দলের পক্ষ থেকে কিছু হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশট প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তরফে তৃণমূল নেতাদের গাড়িতে কড়া তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) এবং তাঁর স্ত্রী রুজিরার গাড়িতেও নজরদারি ও তল্লাশির কথা বলা হয়েছে, কারণ তাঁদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। যদিও এই ‘চ্যাট ফাঁস’ প্রসঙ্গে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
ইসলামপুরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী এই বিষয়টিকে সামনে এনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “তৃণমূলের সব নেতার গাড়িতে তল্লাশি হবে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা বিজেপি নেতাদের গাড়িতে কেন হবে না? শুধুমাত্র তৃণমূলকেই টার্গেট করা হচ্ছে কেন?”
মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে রাজ্যে প্রবেশ করছেন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়ির মাধ্যমেও নানা সামগ্রী আনা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “সাহস থাকলে প্রতিদিন আমার গাড়ি তল্লাশি করুন। আমি কোনও চোর-ডাকাত নই, বিজেপির মতো নয়।” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক আক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেন তিনি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, আসন্ন ভোটকে ঘিরে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। রাজ্যের প্রতিটি সংবেদনশীল বুথে ওয়েব কাস্টিংয়ের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। কোথায় কীভাবে ক্যামেরা বসানো হবে, কীভাবে লাইভ মনিটরিং চলবে—তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে ওই বৈঠকে।
কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, কোনও বুথে যদি ক্যামেরা ঘোরানো থাকে, ঢেকে দেওয়া হয় বা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হয়—তাহলে সেই বুথে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। এমনকি চুইংগাম লাগিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করার মতো ঘটনাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ পেলেই দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কমিশন যে কোনও রকম আপস করতে নারাজ বলেই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। অন্যদিকে, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসকদল ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে মতবিরোধ আরও প্রকট হয়ে উঠছে, যা ভোটের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়াবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


