Tuesday, May 21, 2024
শিক্ষাঙ্গন

‘গোলাপি শহর’ জয়পুর এর বাঙালি স্থপতি বিদ্যাধর ভট্টাচার্য

সংগ্রাম দত্ত:

—————

ভারতের ‘গোলাপি শহর’ কোনটি? কুইজ প্রতিযোগিতা হোক, বা পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন— অনেক সময়ই এই প্রশ্নটির সম্মুখীন হতে হয় অনেককে । অবশ্য উত্তরটিও অনেকের ঠোঁটস্থ। এক ধাক্কায় সবাই বলে উঠবে— জয়পুর। রাজস্থানের বুকে একরাশ রং নিয়ে যেন হাজির হয়েছে এই শহরটি। রাজ্যের রাজধানী বলে কথা। সেইসঙ্গে একদিকে রয়েছে হাওয়া মহল, অন্যদিকে যন্তর মন্তর। সঙ্গে রাজপুত রাজাদের দুর্গ তো আছেই। তবে এসবের ভিড়েও উঠে আসেন এক বঙ্গতনয়। জয়পুরের পাশে অনুচ্চারিতই থেকে যায় তাঁর নাম। অথচ তিনি না থাকলে তৈরিই হত না ‘গোলাপি শহর’। এই গল্প বিদ্যাধর ভট্টাচার্যের…

১৭০০ খ্রিস্টাব্দ। অম্বরের সিংহাসনে বিরাজ করছেন মহারাজা দ্বিতীয় সোয়াই মান সিং। দিব্যি চলছিল রাজপুতদের রাজপাট; তারই মধ্যে মহারাজা সিদ্ধান্ত নিলেন রাজধানী বদল করার। অম্বরে তখন একের পর এক দুর্ভিক্ষ লেগেই আছে। সেইসঙ্গে নিরাপত্তার দিকটাও তো দেখতে হবে! একদিকে মুঘল, অন্যদিকে মারাঠা। এদের সামলানোর জন্য সঠিক নিয়ম মেনে, পরিকল্পনা করে নতুন শহর তৈরি করতে হবে। কিন্তু করবেন কে? রাজপুতদের মধ্যে তো সেরকম কোনো স্থপতি নেই। মহারাজা দ্বিতীয় সোয়াই মান সিং নিজে একজন দক্ষ জ্যোতির্বিদ; যন্তর মন্তরই তার প্রমাণ। এই কাজের উপযুক্ত লোক খুঁজেই পাচ্ছেন না। হঠাৎই তাঁর চোখ গেল অম্বর প্রাসাদের প্রধান কোষাধ্যক্ষের দিকে। তখন সেই পদেই কাজ করছিলেন বিদ্যাধর ভট্টাচার্য্য ।

বিদ্যাধরের শুরুর জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। শুধু এটুকু বলা যায়, অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নৈহাটির এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। কেন বাংলা থেকে রাজস্থানে চলে এসেছিলেন, কী করে সোয়াই মান সিংয়ের দরবারে স্থান পেলেন, সেসব অজ্ঞাত। এর পরের কাহিনিই তাঁর জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্থপতি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন বিদ্যাধর ভট্টাচার্য। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করলেও, তাঁর এই গুণ নজরে পড়ে মহারাজার। জয়পুরকে যদি কেউ রূপ দিতে পারে, তাহলে এই বাঙালি ব্রাহ্মণটিই পারবেন। সোয়াই মান সিংয়ের বিশেষ অনুরোধে জয়পুরের নকশা করার কাজ শুরু করেন বিদ্যাধর। 

অদ্ভুত ছিলেন এই বাঙালি স্থপতি। শহরের নকশা তৈরির জন্য তিনি ফিরে গেলেন প্রাচীনকালে। একদিকে তুলে নিলেন টলেমি, ইউক্লিডের বই; অন্যদিকে রাখলেন প্রাচীন ভারতের শিল্প শাস্ত্র ও বাস্তু শাস্ত্রকে। কেবল স্থাপত্যই নয়, মাথায় রাখলেন জ্যোতির্বিদ্যাকেও। মহারাজা দ্বিতীয় সোয়াই মান সিংও সঙ্গে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত, ১৭২৭ সালে তৈরি হল জয়পুরের নীল নকশা। গোটা শহরকে নটা বর্গক্ষেত্রে ভাগ করলেন বিদ্যাধর। এই নটা ভাগ আমাদের সৌরমণ্ডলের গ্রহদের প্রতীক। দুটো ব্লক রাখলেন রাজা ও সরকারি কাজের জন্য। বাকি সাতটি ব্লকে রাখলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের। গোটা শহর ঘিরে তৈরি হল প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার পাঁচিল। এমনভাবে পরিকল্পনা করা হল যাতে শহরের যেকোনো রাস্তা দিয়ে যেকোনো দিকে যাওয়া যায়। স্থাপত্য, সৌন্দর্যের সঙ্গে এখানে এসে মিশল বিজ্ঞান।

মোট চার বছর সময় লাগল শহরটি তৈরি হতে। যখন হল, তখন তার রূপ দেখে মুগ্ধ হলেন সোয়াই মান সিং। ঠিক এমনটাই চেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে বিদ্যাধর ভট্টাচার্য সম্মান পেয়ে এসেছেন তাঁর দরবারে, আজীবন। তিনি যে ভুল নন, পরবর্তীতে সেটা প্রমাণ করেছিল ইউনেস্কো। ভারতের প্রাচীন শহরগুলোর এমন আধুনিক গঠন দেখা যায় না। বলা হয়, জয়পুর হল ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর এবং প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে সবথেকে সুন্দর গঠন। যার সিংহভাগ কৃতিত্বই যায় একজনের কাছে— বিদ্যাধর ভট্টাচার্য। আজও মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন এই শহরের নকশার দিকে। তাকিয়ে থাকেন এক বাঙালির সৃষ্টির দিকে। আর সেই জয়পুরই মিলিয়ে দিয়েছে রাজস্থান আর নদিয়াকে… 

পিংক সিটি জয়পুর এর ২৯৬-তম বার্ষিকী পালিত হয়।

ভারতের ‘পিংক সিটি’ হিসেবে পরিচিত জয়পুর শহর প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় জয় সিং ১৭২৭ সালের ১৮ নভেম্বর ৷ তাঁর নামানুসারে শহরের নামকরণ করা হয় জয়পুর ৷