Thursday, May 23, 2024
সম্পাদকীয়

দেবী সতীপীঠের একান্ন পীঠের অন্যতম বাংলাদেশের সাতক্ষীরার শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালী মন্দির

সংগ্রাম দত্ত:

—————-

স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞের আগুনেই নিজের প্রাণ ত্যাগ করেছিলেন সতী। নিজের স্ত্রীর মৃত্যুতে রাগে, শোকে, অপমানে তাঁর দেহ কাঁধে নিয়েই তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন মহাদেব। সৃষ্টি রসাতলে যাওয়ার জোগাড়! ধ্বংসের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতেই সৃষ্টিকর্তা বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ছিন্নবিছিন্ন করে দেন। সেই দেহাবশেষ ৫১টি ভাগে ছড়িয়ে পড়ে নানা প্রান্তে।

কথিত, দেবীর দেহাবশেষ যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানেই গড়ে উঠেছে এক একটি সতীপীঠ। আজও সেই সব সতী পীঠ ভীষণ জাগ্রত বলে বিশ্বাস করেন ভক্তরা। কার্ত্তিকি অমাবস্যায় তাই সে সব জায়গায় পুজো হয় মহা ধুমধামে। আর নিত্য পুজো তো আছেই।

সে রকম এক সতীপীঠ হলো যশোরেশ্বরী কালী মন্দির। জনশ্রুতি বলে, এখানে নাকি মায়ের করকমল পড়েছিল। পুরাণ মতে, বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সতীর হাতের তালু পড়েছিল।

যশোরেশ্বরী কালী মন্দির সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। সারা পৃথিবীতে সনাতন ধর্মের দেবী সতীর ৫১ পীঠের একটি যশোরেশ্বরী মন্দির। যশোরেশ্বরী নামের অর্থ যশোরের দেবী।

দেশ-বিদেশের বহু সনাতন ধর্মের অনুসারীরা প্রতি বছর শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর যশোরেশ্বরী কালীমন্দির পরিদর্শনে আসেন ও সেখানে দেবীর সন্তুষ্টির জন্য পূজা অর্চনা দিয়ে থাকেন। সনাতন ধর্মালম্বীদের বাইরেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন সময়ে এ কালী মন্দির দর্শন করেন। সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, দেহত্যাগের পর দেবী সতীর শরীর যে ৫১ খণ্ড হয়ে যায় তাঁর পাঁচটি খন্ড বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। অন্য অংশগুলো ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান ও চীনে পড়ে। এর মধ্যে ঈশ্বরীপুর গ্রামে সতীর করকমল বা পাণিপদ্ম পতিত হয়।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য যশোরেশ্বরী কালী মন্দির বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত মন্দির। পুরান অনুযায়ী সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সতী মায়ের হাতের তালু পড়েছিল। বলা হয় বঙ্গদেশের হিন্দু রাজা প্রতাপাদিত্য মানুষের হাতের তালুর আকারের একখন্ড পাথর অলৌকিকভাবে পেয়েছিলেন। তারপর মায়ের পুজার জন্য যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন প্রতাপাদিত্য।

জানা যায় যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরটি আনারি নামের এক ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্মিত হয়। তিনি এই যশোরেশ্বরী শক্তিপীঠের ১০০টি দরজা নির্মাণ করেন। কিন্তু মন্দিরটি কখন নির্মিত হয় তা জানা যায়নি। পরবর্তীকালে লক্ষ্মণ সেন ও প্রতাপাদিত্য কর্তৃক তাদের রাজত্বকালে এটির সংস্কার করা হয়েছিল। কথিত আছে যে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি এখানকার জঙ্গল থেকে একটি আলৌকিক আলোর রেখা বের হয়ে মানুষের হাতুর তালুর আকারের একটি পাথরখণ্ডের উপর পড়তে দেখেন। পরবর্তীতে প্রতাপদিত্য কালীর পুজা করতে আরম্ভ করেন এবং এই কালী মন্দিরটি নির্মাণ করেন।যশোরেশ্বরী কালী দর্শনের নাম করে সেনাপতি মান সিংহ প্রতাপাদিত্যের দুর্গের নকশা নিয়ে যান। পরে আক্রমণ করে মোগলরা সেটি জয়লাভও করে। কালীর বিগ্রহের সঙ্গে প্রতাপাদিত্য এবং তার সেনাপতি ও পরামশর্দাতা শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়কে বন্দি করেন মান সিংহ।

মন্দির সংস্কারের পাশাপাশি লক্ষ্মণ সেনা বা মহারাজা প্রতাপাদিত্য ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মূল মন্দির সংলগ্ন নাটমন্দির তৈরি করেছিলেন। তবে ১৯৭১ সালে সেই নাট মন্দির ভেঙে পড়ে। লম্বা-চাওড়া বিরাট নাটমন্দিরের আজ কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। নাটমন্দিরের স্মৃতি বহন করে চলেছে শুধুমাত্র কয়েকটি স্তম্ভ। কয়েকশো বছরের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। মূল মন্দিরটি ছাড়া আর সবকিছুই আজ কালের গর্ভে বিলীন। এখন ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে মন্দিরের নওবতখানা। সেই সময়ে জমিদার বাড়ির মধ্যে অবস্থিত ছিল মন্দিরটি। তত্‍কালিন জমিদার মায়ের নামে প্রায় ২০০ বিঘা জমি দান করেছিলেন।

তন্ত্রচূড়ামণিতে বলা হয়েছে-‘যশোরে পানিপদ্ম দেবতা যশোরেশ্বরী,/চণ্ডশ্চ ভৈরব যত্র তত্র সিদ্ধ ন সংশয়।’ 

অর্থাত্‍ যশোরে সতীর পাণিপদ্ম বা করকমল পড়েছে। 

দেবীর নাম যশোরেশ্বরী,আর তাঁর ভৈরব হলেন চণ্ড। 

এই সতীপীঠে কায়মনোবাক্যে পুজা করলে ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ হয় বলে সর্বসাধারণের বিশ্বাস।

মন্দির-বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত মাতৃমূর্তির শুধু মুখমণ্ডলই দৃষ্টিগোচর হয়। শ্রীযশোরেশ্বরীর কণ্ঠের নীচে তাঁর শ্রীহস্ত ও শ্রীচরণ কিছুই নজরে পড়ে না। মূর্তির অবয়ব পুরোটাই মখমলে আবৃত। মায়ের মাথার ওপর টকটকে লাল রঙের চাঁদোয়া। কণ্ঠে রক্তজবার মালা ও নানা অলঙ্কার। মাথায় সোনার মুকুট। লোলজিহ্বা দেবীর ভীষণা মূর্তি। যশোরেশ্বরী মাতা ভীষণদর্শন হলেও মায়ের শ্রীবদনে অপূর্ব দেবীভাব রয়েছে। ভক্তের পরম আশ্রয়ের শেষ কথা যেন তিনিই। এই মন্দিরে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার নিত্যপূজা হয়। 

শ্রী যশোরেশ্বরীর পুজা হয় মন্ত্রমতে। মায়ের পুজায় সমবেত ভক্তগণ ফুল, ফল ও নানাধরনের মিষ্টি আনেন। মাতৃমূর্তির সামনে সুন্দর করে কাঁসার থালা ও মাটির পাত্রে থরে থরে নৈবেদ্য সাজানো হয়। প্রতিবছর মন্দিরে খুব ধুমধাম করে শ্যামাপুজা হয়। মা ভীষণ জাগ্রত। শ্যামাপুজায় এই মন্দিরে হাজার হাজার ভক্ত পুজা দেন। মানত করেন। বড় করে হোমযজ্ঞ হয়। মাকে নানা অলঙ্কারে সাজানো হয়। মন্দিরের সামনে তিনদিন মেলা বসে। ছাগবলি হয়। মন্দিরের বারান্দায় হিন্দু ভক্তদের পাশাপাশি মুসলিম ষভক্তরাও মানত করতে আসেন। স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন এই মন্দিরে।

মন্দিরটি তাঁর প্রাচীন ঐতিহ্য হারালেও এক কণাও কমেনি মা যশোরেশ্বরীর মহিমা। বরং তা যেন উত্তরোত্তর বাড়ছে। 

মা যশোরেশ্বরীর মহিমার কথা শোনা যায় স্থানীয় মুসলিমদের মুখেও। অতীতে তাঁর মহিমার কথা যশোর থেকে পৌঁছেছিল দিল্লির মুঘল রাজ দরবারেও। অম্বররাজ মানসিংহ এক পুরোহিতের সাহায্যে মা যশোরেশ্বরীর বিগ্রহটি চুরি করে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। যশোরের মন্দির থেকে চুরি করা মা যশোরেশ্বরী কালীর বিগ্রহটি রাজস্থানের অম্বর দুর্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। কিন্তু বঙ্গবিজয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই স্বপ্নে রুষ্ট মা কালীর দর্শন পান। তারপরেই সূক্ষ্মীবতী নদীর তীরে মা কালীর নতুন একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এদিকে পরবর্তীকালে যশোরের মূলমন্দিরে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয় মা যশোরেশ্বরীর বিগ্রহ। 

 ২০২১ সালের ২৭শে মার্চ ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরে বাংলাদেশ সফরে এসে সেখানে পুজা দেওয়ার সুযোগ ছাড়েননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। পুজার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মোদী বলেছিলেন, “আমি মা কালীর চরণে আসতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আমি যখন ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এসেছিলাম তখন মা ঢাকেশ্বরীর চরণে মাথা নত করার সুযোগ হয়েছিল। আর এখন ৫১ শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম মা কালীর এই শক্তিপীঠে আসার সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য।” পুজার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজের হাতে মায়ের মাথায় মুকুট পরান। রুপার তৈরী সেই মুকুটটি ছিল সোনার আস্তরণে মোড়া।