ক্যান্সারের চিকিৎসা চলাকালীন বোর্ড পরীক্ষায় ৯৬.৬ শতাংশ নম্বর! অনুপ্রেরণার নাম আরভ অরোরা
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিতেও যে স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরা যায়, তারই এক অনন্য উদাহরণ দিল দিল্লির ১৫ বছরের কিশোর আরভ অরোরা। মারণ রোগ ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে গিয়েও ২০২৬ সালের সিবিএসই দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষায় ৯৬.৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে নজির গড়েছে সে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে, যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তার মাঝেই নিজের লক্ষ্য থেকে একটুও বিচ্যুত হয়নি এই কিশোর। আজ তার এই সাফল্যের গল্পই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল, অনুপ্রাণিত করছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে।
দক্ষিণ দিল্লির মেহরাউলির বাসিন্দা আরভের জীবন একসময় ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে সাধারণ এক স্কুলজীবন। কিন্তু ২০২২ সালে, যখন সে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, তখনই তার জীবনে নেমে আসে এক বড় ঝড়। চিকিৎসকদের পরীক্ষায় ধরা পড়ে ক্যান্সার। হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু।
শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা, হাসপাতালের বারবার যাতায়াত এবং শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই। মেরুদণ্ডে একটি জটিল অস্ত্রোপচার করতে হয় তাকে, যার পরবর্তী সময় ছিল আরও কঠিন। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় তাকে ঘরবন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে। সেই সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনই যেখানে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল, সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তবে এখানেই অন্যদের থেকে আলাদা আরভ। অসুস্থতার কাছে হার না মেনে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যখনই শরীর একটু সুস্থ থাকত, তখনই বই হাতে তুলে নিত। হাসপাতালের বেডেই অনলাইন ক্লাসে যোগ দিত, শিক্ষকদের পড়ানো মন দিয়ে শুনত এবং বাড়িতে ফিরে নোটস তৈরি করত।
তার বাবা অজয় অরোরা, যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক, জানিয়েছেন, “চিকিৎসার সময়ও ওর পড়ার ইচ্ছেটা একটুও কমেনি। আমরা অনেক সময় বলতাম বিশ্রাম নিতে, কিন্তু ও নিজেই পড়তে বসে যেত।”
স্কুলের শিক্ষকরাও আরভের এই লড়াইয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিয়মিত পড়াশোনার গাইডেন্স, অতিরিক্ত সময় দিয়ে বোঝানো—সব মিলিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতা ছিল অসামান্য।
শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, এই সময়ে মানসিক চাপও ছিল প্রচুর। কিন্তু বন্ধুদের সমর্থন, পরিবারের ভালোবাসা এবং কাউন্সেলরদের পরামর্শ তাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে।
আরভের বাবা জানান, “আমরা ভেবেছিলাম ও শুধু কোনওভাবে পরীক্ষায় পাশ করলেই খুশি হব। কিন্তু ফলাফল দেখে আমরা সত্যিই অবাক। এই পরিস্থিতিতে এমন রেজাল্ট করা সহজ নয়।”
চিকিৎসার সময় আরভ নিজের অসুখ সম্পর্কে জানার আগ্রহও দেখায়। বিভিন্ন বিষয় পড়ে চিকিৎসকদের প্রশ্ন করত, যা তার কৌতূহল এবং জ্ঞানের প্রতি আগ্রহকে আরও স্পষ্ট করে।
এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে একটি বড় স্বপ্ন। ছোটবেলা থেকেই গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ রয়েছে আরভের। ভবিষ্যতে সে অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় এবং একদিন মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।
তার লক্ষ্য দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা নাসাতে কাজ করা। অবসর সময়ে সে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও সফল ব্যক্তিদের জীবনী পড়তে ভালোবাসে, যা তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।
আরভ অরোরার এই সাফল্য শুধুমাত্র একটি ভালো রেজাল্ট নয়—এটি এক লড়াইয়ের গল্প, এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, যখন অনেকেই সামান্য সমস্যায় ভেঙে পড়ে, সেখানে এই কিশোর দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতাকে জয় করতে হয়।
তার এই যাত্রা প্রমাণ করে—পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, নিজের উপর বিশ্বাস এবং দৃঢ় মনোবল থাকলে কোনও বাধাই শেষ কথা নয়।
আজ আরভ অরোরা শুধু একজন মেধাবী ছাত্র নয়, বরং অসংখ্য মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার গল্প আমাদের শেখায়—স্বপ্ন দেখার সাহস থাকতে হবে, আর সেই স্বপ্ন পূরণে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে শেষ পর্যন্ত।
ক্যান্সারের মতো মারণ রোগের সঙ্গে লড়াই করেও যে জীবনকে জয় করা যায়, আরভ তারই জীবন্ত প্রমাণ।


