Saturday, October 31, 2026
Latestআন্তর্জাতিক

তালিবানের মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে জাকির নায়েক

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষার ওপর তালিবানের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সওয়াল করে তীব্র বিতর্কে জড়ালেন পলাতক ভারতীয় ইসলাম ধর্মপ্রচারক জাকির নায়েক। এমনকী, নারীদের উচ্চশিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞাকেও কার্যত সমর্থন করেছেন তিনি বলে অভিযোগ উঠেছে। তার মন্তব্য ঘিরে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বহু মানুষ একযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে জাকির নায়েকের সম্পর্ক ও তাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিওতে জাকির নায়েক দাবি করেন, নিরাপত্তার অভাব এবং মহিলা শিক্ষকের ঘাটতির কারণে তালিবান আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আপাতত বন্ধ রেখেছে। তার বক্তব্য, এটি শিক্ষার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বিলম্ব। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানের মহিলারা ইসলামিক শিক্ষা, শরিয়াহ, আরবি এবং কোরান নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করতে পারছেন।

জাকির নায়েকের এই মন্তব্যের পর ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং শিক্ষাবিদরা তার সমালোচনায় সরব হয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে কীভাবে মহিলা শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব?

ভিডিওতে জাকির নায়েক বলেন, “সংবাদমাধ্যমে যা প্রকাশিত হয়, তার সবটাই সত্য নয়।” তালিবানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার দাবি করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষা পিছিয়ে দিলে তাতে কোনও সমস্যা নেই।

এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মালালা ইউসুফজাইয়ের বাবা এবং ব্রিটেন-ভিত্তিক পাকিস্তানি সমাজকর্মী জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই জাকির নায়েকের বক্তব্যকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

অন্যদিকে, ভারতীয় ইসলামি পণ্ডিত এ ফাইজুর রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে জাকির নায়েককে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

ভারত ছাড়ার পর মালয়েশিয়ায় আশ্রয় জাকির নায়েকের

২০১৬ সালে ঢাকা ক্যাফে হামলায় জড়িত এক জঙ্গি জাকির নায়েকের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠার পর ভারত ছাড়েন তিনি। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, বেআইনি কার্যকলাপে যুক্ত থাকা এবং অর্থ পাচারের মতো অভিযোগে মামলা হয়। যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাকির নায়েক।

২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেন তিনি এবং সেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান। তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত ভারতের প্রত্যর্পণের চেষ্টা সফল হয়নি।

তালিবানের মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কী দাবি জাকির নায়েকের?

জাকির নায়েক দাবি করেন, তালিবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগতভাবে কথা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে মেয়েরা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারছে। কিন্তু নিরাপদ পরিবেশের অভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, আফগানিস্তানে পর্যাপ্ত মহিলা শিক্ষক নেই বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে ইসলামিক শিক্ষা, শরিয়াহ, আরবি এবং কোরান নিয়ে মহিলাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এমনকী, তাঁরা স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিও করতে পারছেন বলে দাবি করেন তিনি।

জাকির নায়েকের কথায়, আফগানিস্তানে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা বন্ধ রয়েছে বলে যে প্রচার করা হচ্ছে, তা ভুল তথ্য।

তবে রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

ইউনিসেফের (UNICEF) আগস্ট মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে আফগানিস্তানে ২৬ লক্ষেরও বেশি মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়েও মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও মহিলাদের জন্য মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ কার্যত বন্ধ।

২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তালিবান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষের পৃথকীকরণ চালু করে এবং মেয়েদের পড়ানোর জন্য মহিলা শিক্ষকের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক স্কুল পুনরায় চালুর পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয় তারা।

এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের পড়াশোনা নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নার্সিং ও ধাত্রীবিদ্যা-সহ বিভিন্ন চিকিৎসা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানেও মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে তালিবান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান পুনর্গঠন বিষয়ক বিশেষ মহাপরিদর্শকের দফতর (SIGAR) এবং আফগানিস্তানে রাষ্ট্রসংঘের সহায়তা মিশনের (UNAMA) রিপোর্টেও এই নিষেধাজ্ঞাগুলির উল্লেখ রয়েছে।

জাকির নায়েকের বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরব আফগানরাও

জাকির নায়েকের দাবির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন আফগানিস্তানের প্রাক্তন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আজিম শিনওয়ারি। বর্তমানে তিনি বেলজিয়ামে বসবাস করেন।

সমাজমাধ্যম এক্সে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মেয়েদের পড়াশোনাই যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন মহিলা শিক্ষক তৈরি হবে কীভাবে?

এছাড়াও আফগান মহিলারা ইসলামিক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করছেন বলে জাকির নায়েক যে দাবি করেছেন, তার প্রমাণও চেয়েছেন শিনওয়ারি। তার প্রশ্ন, এই দাবির সমর্থনে নির্ভরযোগ্য তথ্য কোথায়?