গো-হত্যার মামলায় গুজরাটে তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, রায়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উল্লেখ আদালতের
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: গুজরাটের গান্ধীনগর জেলার একটি আদালত গো-হত্যার মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে ২৭৭ কেজি গোমাংস উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় এই সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। রায় দিতে গিয়ে গরুর ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরতে মনুস্মৃতি, বেদ-সহ বিভিন্ন হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উল্লেখ করেছে আদালত।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার অতিরিক্ত দায়রা বিচারক বি আর রাজপুত এই রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্ত তিনজন হলেন ওয়াসিম কুরেশি, মহম্মদ রফিক কুরেশি এবং আসফাক বাহেলিম। প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৩ লক্ষ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।
রায়ে মনুস্মৃতির উল্লেখ করে বিচারক বলেন, গরু কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং বস্তুগত সমৃদ্ধি ও ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থের উল্লেখ করে আদালত জানায়, গবাদি পশুর সুরক্ষা ও যত্নের প্রাথমিক দায়িত্ব ঋষি মনু বৈশ্য সম্প্রদায়ের ওপর অর্পণ করেছিলেন। বৈদিক বিবাহের একটি বিশেষ প্রথা ‘অর্শ বিবাহ’-এর ক্ষেত্রেও গরু ও ষাঁড়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বেদ ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উল্লেখ করে আদালত আরও জানায়, তপস্যার শক্তিতে পৃথিবীতে অমৃতের বিন্দু পতিত হলে দৈবী গাভী কামধেনুর আবির্ভাব ঘটে। তাঁকে পৃথিবীর সমস্ত গো-বংশের আদি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গরুকে ‘জগতের মাতা’ হিসেবে দেখা হয় এবং তাঁর মধ্যে ৩৩ কোটি দেবদেবীর বাস বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। গরুর চারটি পা চারটি বেদের প্রতীক বলেও উল্লেখ করা হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ অগস্ট গান্ধীনগর জেলার জামলা গ্রামের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। সেখান থেকে ২৭৭ কেজি গোমাংস, গরু জবাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সন্দেহ করা অস্ত্র এবং মাংস পরিবহণের জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত বাবা ও ছেলে দুর্বল অথবা দুধ দিতে অক্ষম মহিষ কিনে আনতেন। এরপর আহমেদাবাদ থেকে চারজনকে ডেকে এনে বাড়িতে সেগুলি জবাই করতেন এবং আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে মাংস বিক্রি করতেন। প্রসিকিউশনের দাবি, অভিযুক্তরা গোলাম মইনের কাছে ওই মাংস বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন।
মামলার বিচার চলাকালীন ছয় অভিযুক্তের মধ্যে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন ৫৪ জন সাক্ষী এবং ১৮টি নথিভিত্তিক প্রমাণ পেশ করে।
গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গুজরাটে গো-হত্যার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন যে কোনও রকম ছাড় দেবে না, এই রায় তার স্পষ্ট বার্তা। পাশাপাশি সঠিক তদন্ত ও শক্তিশালী প্রমাণ পেশ করার জন্য গান্ধীনগর পুলিশ এবং সরকারি আইনজীবীদের অভিনন্দন জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে গুজরাট সরকার ১৯৫৪ সালের গুজরাট অ্যানিম্যাল প্রিজারভেশন আইনে সংশোধন এনে গো-হত্যার শাস্তি বাড়িয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করে। এর ফলে গো-হত্যার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান চালু করা দেশের প্রথম রাজ্য হয় গুজরাট। সংশোধিত আইনে গোমাংস পরিবহণ, মজুত এবং বিক্রির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।
এর আগে ২০১১ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে গুজরাট সরকার গো-হত্যা এবং গরুর মাংস পরিবহণ ও বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে আইন সংশোধন করেছিল।
সর্বশেষ এই মামলায় ২৭৭ কেজি গোমাংস উদ্ধারের ঘটনায় তিন অভিযুক্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ দিল আদালত।

