Friday, April 12, 2024
সম্পাদকীয়

বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস “আলালের ঘরের দুলাল”- লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র

বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস “আলালের ঘরের দুলাল”-এর লেখক প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক প্যারীচাঁদ মিত্র। ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’ তার ছদ্মনাম। প্যারীচাঁদ মিত্র ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ২২শে জুলাই কলকাতার এক বণিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। তার পিতা রামনারায়ণ মিত্র। তিনি ছিলেন কলকাতার প্রতিষ্ঠিত কাগজ ও হুন্ডি ব্যবসায়ী। তার মাতা আনন্দময়ী দেবী। তিনি তৎকালিন নারীশিক্ষার সেই অন্ধকার যুগেও যথেষ্ট শিক্ষাপ্রাপ্ত ছিলেন।

প্যারীচাঁদ মিত্র বাল্যকালে গুরুমহাশয় ও মুনশির নিকট থেকে সংস্কৃত ও ফার্সি শিক্ষা লাভ করেন। ১৮২৯ সালে ইংরেজি শিক্ষা লাভের জন্য হিন্দু কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন হিন্দু কলেজে অধ্যাপক ছিলেন হেনরি ডিরোজিও। প্যারিচাঁদ মিত্র তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৩৫ সালে হিন্দু কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন।

প্যারীচাঁদ মিত্রের কর্মজীবন শুরু হয় ১৮৩৬ সালে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান হিসাবে যোগদানের মাধ্যমে। পরে লাইব্রেরিয়ান থেকে পদোন্নতি পেয়ে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির সচিব হন। এছাড়া তিনি আমদানি-রপ্তানি এবং চালের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থোপার্জন করেন। তাই তাকে একজন সফল ব্যবসায়ীও বলা যায়।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সভা সমিতির সাথে জনকল্যাণ মূলক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি পত্যক্ষভাবে বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি, জ্ঞানোপার্জিকা সভা, বেথুন সোসাইটি, এশিয়াটিক সোসাইটি, ডেভিড হেয়ার মেমোরিয়াল সোসাইটি, জ্ঞানান্বেষণ সভা, পশু-ক্লেশ নিবারণী সভা, এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড হর্টিকালচারাল সোসাইটির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য ছিলেন।

তাঁর ইংরেজি ভাষায় রচিত লেখাসমূহ ছাপা হত ইংলিশম্যান, ইন্ডিয়ান ফিল্ড, ক্যালকাটা রিভিউ, হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া প্রভৃতি পত্রিকায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্যারীচাঁদ তৎকালিন পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেও সফল হোন।

নারীশিক্ষার সেই অন্ধকার যুগে নারীদের আত্মসামাজিক উন্নতির জন্য একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি নারীশিক্ষার প্রচারে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তিনি বিধবাবিবাহের পক্ষে ছিলেন। তিনি বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেন।

তিনি ফার্সি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বহু গ্রন্থ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’। এটি সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। এখানে তিনি যে কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছিলেন তা ‘আলালী ভাষা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এবং তিনি এই উপন্যাসে মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলা সাহিত্যের গদ্যরীতির নিয়ম ভেঙে চলিত ভাষারীতি প্রয়োগ করেন।এই উপন্যাসের ভাষা ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। উপন্যাসটি ‘দি স্পয়েল্ড চাইল্ড’ নামে ইংরেজিতেও অনুবাদ করা হয়েছিল।

এই গ্রন্থটি ছাড়াও- মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায় (১৮৫৯), অভেদী(১৮৭১), আধ্যাত্মিকা(১৮৮০), যৎকিঞ্চিৎ, রামারঞ্জিকা, বামাতোষিণী, গীতাঙ্কুর প্রভূতি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

তিনি কয়েকটি ইংরেজি গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যে ‘The Zemindar and Ryots’ গ্রন্থটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখেছিলেন। যেটি তখনকার সময়ে অনেক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।

লেখক প্যারীচাঁদ মিত্রের মোট ১৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ১১টি বাংলায়।

১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর ৬৯ বছর বয়সে প্রখ্যত এই ঔপন্যাসিক কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।