প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন ঘনিষ্ঠদের ৮৫ কোটি টাকার টেন্ডার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল ৩০ লাখ টাকা, চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ইডির
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: কলকাতার দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা দাবি করেছে, ‘মাসআর্ট’ (Mahanirban Road Mass Art Society)-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগের তদন্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে। একই তদন্তের সূত্রে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা স্থানান্তরের কথাও জানিয়েছে ED। তবে ইন্দ্রনীল সেনের দাবি, ওই অর্থ ‘গানের রয়্যালটি’ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। ED-র প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই লেনদেনের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ বা তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
ED জানিয়েছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA)-এর ১৭ নম্বর ধারায় কলকাতার ১৫টি জায়গায় তল্লাশি ও বাজেয়াপ্ত করার অভিযান চালানো হয়। মাসআর্ট সোসাইটির পুজোর ‘প্রিভিউ শো’ পরিচালনা এবং সেই সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছিল। তদন্তের সূত্রপাত বৌবাজার থানায় দায়ের হওয়া একটি FIR থেকে। অভিযোগকারী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। মামলায় ইন্দ্রনীল সেন, মাসআর্টের সভাপতি মধুছন্দা সেন, সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি বসু, সহ-সভাপতি সায়ন্তন মৈত্র এবং কোষাধ্যক্ষ রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাসআর্ট সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছিল নিজেদের ইউনেস্কোর সঙ্গে যুক্ত বা পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে। ED-র দাবি, ইউনেস্কোর নাম, সুনাম ও লোগো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না।
ED-র বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতার ২৪টি নির্বাচিত দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ‘প্রিভিউ শো’ দেখানোর জন্য টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল। টিকিটের দাম ছিল ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এক লক্ষেরও বেশি টিকিট ইস্যু করা হয়েছিল বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি। তাদের অভিযোগ, টিকিট বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একাংশ নগদে তুলে নেওয়া হয় এবং অন্য অংশ ‘বিবিধ খরচ’-এর মতো বিভিন্ন খাতে দেখানো হয়। এই অর্থের একটি অংশ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও ED অভিযোগ করেছে।
মাসআর্টের আর্থিক লেনদেনের তদন্ত করতে গিয়ে ইন্দ্রনীল সেনের মন্ত্রী থাকাকালীন সরকারি টেন্ডারের বিষয়টিও সামনে আসে বলে জানিয়েছে ED। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, তাঁর মন্ত্রিত্বের সময়ে পর্যটন ও সংস্কৃতি দফতরের ৮৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একাধিক টেন্ডার ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং দীপেশ রায়ের মালিকানাধীন সংস্থাগুলিকে দেওয়া হয়েছিল। ED-র দাবি, দু’জনকেই ইন্দ্রনীল সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার আরও অভিযোগ, ওই টেন্ডার পাওয়া সংস্থাগুলি পরবর্তী সময়ে ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করেছিল। একইসঙ্গে ওই সংস্থাগুলির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের নগদ টাকা তোলার তথ্যও পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছে ED।
এর পাশাপাশি, ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অক্টেভ রেকর্ডস-এর অ্যাকাউন্টে মন্ত্রিত্বের সময়ে ৩.৮ কোটি টাকার বেশি নগদ জমা পড়েছিল বলে ED-র প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্ট থেকেই প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছিল বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। ED-র বক্তব্য অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল সেন তদন্তকারীদের কাছে ওই অর্থকে ‘রয়্যালটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই লেনদেনের বিষয়ে অবশ্য আরও তথ্য সামনে আসার অপেক্ষা রয়েছে। কোন গান বা সৃষ্টির রয়্যালটি হিসেবে ওই অর্থ দেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও হিসাবপত্র কী ছিল এবং লেনদেনের সময়কাল কী—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ED-র প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই লেনদেনের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি এবং ওই অর্থ অপরাধের টাকা—এমন সিদ্ধান্তও সংস্থাটি প্রকাশ করেনি।
এদিকে, তল্লাশির পর ইন্দ্রনীল সেনকে কলকাতার সল্টলেকের CGO কমপ্লেক্সে প্রায় ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে। তাঁকে পরবর্তী দফায় ফের হাজিরার নোটিসও দেওয়া হয়েছে। ED জানিয়েছে, তল্লাশিতে কিছু ডিজিটাল ডিভাইস ও নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত এখনও চলছে।

