Tuesday, May 21, 2024
সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের চন্দ্রাবতীর মন্দির

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার কাচারী পাড়ার পাতুয়াইর গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন এক শিবমন্দির। এই মন্দিরের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী দেবী ও তাঁর পূর্বপুরুষের স্মৃতি। এই মন্দিরটি এখন বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। 

মনসা মঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা ও ভাসান কবি দ্বিজবংশী দাস এবং সুলোচনা দাসের কন্যা চন্দ্রাবতী দেবী (১৫৫০-১৬০০) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় প্রথম মহিলা কবি। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সুখ-দুঃখ নিয়ে চন্দ্রাবতীর রচিত দস্যু কেনারামের পালা, মলুয়া লোকপালা, রামায়ণ ও অসংখ্য লোকগীতি এখনও এখানকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ময়মনসিংহ গীতিকা’র পরতে পরতে মিশে আছে কবি চন্দ্রাবতীর অমর কাব্য, প্রেম আর বিরহের উপাখ্যান। চন্দ্রাবতীর লেখা রামায়ণ প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ময়মনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক ড. দীনেশ চন্দ্র সেন। 

কিশোর বয়সে পছন্দের পুরুষ জয়ানন্দের সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ স্থির হওয়া সত্বেও জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে অন্যত্র বিবাহ করলে হৃদয়ের দু:খ চেপে চন্দ্রাবতী সারাজীবন কুমারী থাকার প্রতিজ্ঞা করেন এবং সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি বাকি জীবন মহাদেবের আরাধনা করে কাটানোর মানসে একটি শিবমন্দির স্থাপন করে দেওয়ার জন্য পিতার নিকট অনুরোধ করেন। কন্যার আবদার রক্ষা করে তাঁর পিতা পাতুয়াইর গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে প্রতিষ্ঠা করেন শিবমন্দির। সেই ফুলেশ্বরী নদীর কোন চিহ্ন এখন নেই। তবে সেই শিবমন্দির এখনো কালের নীরব সাক্ষী হয়ে কবি চন্দ্রাবতী ও তাঁর পূর্বপুরুষের স্মৃতি বহন করে চলেছে। 

‘চন্দ্রাবতীর মন্দির’ নির্মিত হয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে। দেউলশৈলীর দ্বিতল এই মন্দিরটি অষ্টভূজাকৃতি, প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৮ ফুট, উচ্চতা প্রায় ৩২ ফুট। নিচতলায় একটি মাত্র কক্ষ এবং তার একটিই প্রবেশ পথ। এই কক্ষের ভেতরে রয়েছে জানালা সদৃশ ৭টি কুলুঙ্গি ও শিবলিঙ্গ। দ্বিতীয় তলায়ও আছে অর্ধবৃত্তাকার খিলানের সাহায্যে নির্মিত প্রশস্ত কুলুঙ্গি, এর ভিতরে এক সময় পোড়ামাটির অসংখ্য চিত্রফলকের অলঙ্করণ ছিল, যা এখন আর অবশিষ্ট নেই। দ্বিতীয়তলা থেকে মন্দিরের চূড়া ক্রমশ সরু হয়ে শেষ উচ্চতায় গিয়ে শেষ হয়েছে। চূড়ার শেষপ্রান্তে রয়েছে খাঁজকাটা কারুকাজ ও কলসাকৃতির শীর্ষদেশে স্থাপিত ত্রিশূল। 

চন্দ্রাবতীর মন্দির’এর অদূরে আরো একটি অপেক্ষাকৃত ছোট শিবমন্দির আছে। এটিও অষ্টভূজাকৃতি এবং অনেকটা একই নির্মাণশৈলী বিশিষ্ট। অনেকে এই মন্দিরটিকে চন্দ্রাবতীর পিতা দ্বিজবংশী দাসের মন্দির বলে মনে করেন। এই মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে অথবা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে নির্মিত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। এর পাশেই রয়েছে একটি অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ, যেটি স্থানীয় জমিদার নীলকণ্ঠ রায় অথবা দ্বিজবংশী দাসের বাড়ি হতে পারে। 

জয়ানন্দ কিন্ত একসময় স্বীয় কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসতে চাইলেও চন্দ্রাবতীর নিকট থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিজের অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে ফুলেশ্বরী নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন। আর নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় সেই শিবমন্দিরে আরাধ্য দেবতার সামনেই স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নেন চন্দ্রাবতী।

চন্দ্রাবতীর জীবনাবসানের ফলে রামায়ণ রচনার কাজ অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিশালায় সংরক্ষিত সেই অসমাপ্ত রামায়ণ এখনো বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর অবদান এবং তাঁর পূণ্যস্মৃতি বহন করে চলেছে।

‘চন্দ্রাবতীর মন্দির’ স্থানীয় একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক প্রায়ই এখানে ঘুরতে আসেন। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই শিবমন্দিরটি অধিগ্রহণ করে ১৯৯০ এর দশকে এর কিছু অংশের সংস্কার সম্পন্ন করেছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবির স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের আরো অনেক কিছু করার আছে বলে মনে করেন এলাকাবাসী। যেমন, কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিকে ধরে রাখতে এই শিবমন্দিরটিকে ঘিরে একটি সমৃদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তোলা যেতে পারে। কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিধন্য শিবমন্দির এবং তাঁর অসংখ্য লোকগীতিকে উপজীব্য করে এখানে বার্ষিক ‘চন্দ্রাবতী মেলা’র আয়োজন করা যেতে পারে, যা হতে পারে বাংলার প্রথম মহিলা কবির স্মৃতিকে অমলিন রাখার একটি উৎকৃষ্ট উদ্যোগ। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রয়োজন প্রাচীন এই মন্দিরের দৈন্যদশার অবসান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং প্রচার বৃদ্ধি।