‘রাজনীতি পরে, রুটি আগে’, ভারত থেকে ২ লাখ টন গম কিনছে বাংলাদেশ
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে গম সরবরাহে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। গমের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও গম ও গমের আটার দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে চার বছর পর ফের ভারত থেকে বড় পরিমাণে গম আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্টে ভারত গম রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার পর বাংলাদেশি আমদানিকারকরা ভারতের কাছ থেকে ২ লাখ টনেরও বেশি গম কেনার জন্য ঋণপত্র (এলসি) বুকিং করেছে। ২০২২ সালের পর এটাই ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রথম বড় আকারের গম আমদানি হতে চলেছে।
আমদানিকারকদের জন্য ভারতীয় গমের অন্যতম সুবিধা হল ভৌগোলিক নৈকট্য। এসব গমের একটি বড় অংশ রেলপথে বাংলাদেশে আসবে। পরিবহন খরচসহ বাংলাদেশে পৌঁছনোর পর প্রতি টন ভারতীয় গমের দাম পড়বে আনুমানিক ৩০৫ থেকে ৩২৬ ডলার। অর্থাৎ প্রতি কেজি গমের আমদানি মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫২ টাকা থেকে ৪০ দশমিক ১০ টাকা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন গম উৎপাদন করে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ৭০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়। এর একটি বড় অংশ আগে ভারত থেকেই আসত। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ভারত গম রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে বাংলাদেশকে ভারত ছাড়াও আর্জেন্টিনা, কানাডা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো দেশ থেকে গম আমদানি করতে হয়।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আমদানি করা গমের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসতে শুরু করে। কিন্তু বর্তমানে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বন্দরগুলিতে হামলার ঘটনায় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম পরিবহনে নতুন করে ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস হিসেবে ভারতের দিকে ঝুঁকছেন বাংলাদেশের আমদানিকারকরা।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও গমের চাহিদা বেড়েছে। গত এক মাসে ঢাকায় পরিশোধিত গমের আটার দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে চালের দামও উচ্চ পর্যায়ে থাকায় ভোক্তাদের একটি অংশ চালের পরিবর্তে গমের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে গত আগস্টে ভারত চার বছর ধরে চলা গম রপ্তানির বিধিনিষেধ তুলে নেয়। ২০২৫-২৬ শস্য বছরে ভারতে রেকর্ড ১২০ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন টন গম উৎপাদনের পর অভ্যন্তরীণ বাজারে গমের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে সরকারি গুদামগুলিতে বিপুল পরিমাণ গম মজুত হয় এবং খোলা বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে গমচাষিদের আর্থিক ক্ষতি কমানো এবং উদ্বৃত্ত গম কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে ভারত সরকার ফের রপ্তানির সুযোগ তৈরি করে। ভারতের বিপুল মজুত এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য—দুইয়ের সমন্বয়ে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প সরবরাহের পথ খুলে যায়।
ভারত থেকে গম আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ ও সময়—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপথে গম আমদানিতে যেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে, সেখানে ভারতের রেলপথে কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে গম পৌঁছনো সম্ভব। ফলে আমদানিকারকদের পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলিও ভারতীয় গমের দিকে ঝুঁকছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার আমদানিকারকরাও সম্প্রতি ভারত থেকে প্রতি টন প্রায় ৩২৫ ডলার দরে প্রায় ৬০ হাজার টন গম কিনেছেন।

