নুমাঈশ ২০২৬-এ তরুণদের সমাজসেবার অনন্য উদ্যোগ
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: সেদিনের মিছিল যেন হয়ে উঠলো এক আনন্দ মেলার রূপে। যারা হয়তো বলতে চায় যে, সূর্য ডোবার পালা যেন শেষ হয় এখনই। কারণ জীবন যাদের অন্ধকারে ডুবে থাকে জীবনের বেশির ভাগ সময়, তাদের প্রয়োজনেই যেন এ অস্ত অনেক বিরাম নিয়ে আসে। সেই কারণেই বোধহয় অঙ্কিত মিত্র ও তার হাত ধরা মানুষগুলো ইপ্সিতা কারফর্মা, তমালিয়া দাশগুপ্ত, উদয়ন মিত্র, তিয়াশা চক্রবর্তী, প্রতিভা শর্মা, শ্রেয়সী কর, সুরজিৎ নাগ চৌধুরী, সুমিত এম ভি এবং অন্যান্যরা অনুভব করেছেন যে এই হাত ধরে এগিয়ে চলাতেই প্রাপ্তি হয় অনেক অনেক আলো। এবং তাদের বিশ্বাস যে এই আলোতেই হয়ে উঠতে পারেন এক এক জন সূর্যমুখী। তবে তারা এই আলোর সন্ধান পান এক একটি মোমবাতির ক্ষুদ্র আলোর থেকে, যেখানে এক ঝাঁক স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীর মোমবাতি মিছিল থেকে ২০১৪ সালে পথচলা শুরু। সেই উদ্যোগই আজ রূপ নিয়েছে সমাজসেবামূলক সংস্থা ‘হেল্পিং হ্যান্ড’-এ। তাদের উদ্যোগে কলকাতায় সফলভাবে অনুষ্ঠিত হল সংস্থার ফ্ল্যাগশিপ চ্যারিটেবল প্রদর্শনী ‘নুমাঈশ ২০২৬’।
গত ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্র সরোবরের ‘গ্যালারি গোল্ড’-এ দু’দিনের এই প্রদর্শনী ও বিক্রয় মেলায় ছিল হাতে তৈরি চকলেট, নিমকি, ঘর সাজানোর সামগ্রী, উলের তৈরি বিভিন্ন পণ্য, ব্যাগ, জুয়েলারি ও পোশাক-সহ মোট ২১টি স্টল। প্রতি বছরের মতো এবারও প্রদর্শনীতে দর্শক ও ক্রেতাদের ভালো সাড়া মিলেছে বলে জানান ‘কাটজুনগর হেল্পিং হ্যান্ড সোসাইটি’র সদস্যরা। বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
তরুণ-তরুণীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংস্থায় বর্তমানে প্রায় ৫০ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে স্কুলশিক্ষক, কলেজ শিক্ষক, ব্যাঙ্ককর্মী, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সাইকোলজিস্ট থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারাও রয়েছেন। নিজেদের উপার্জন থেকে একটি অংশ সমাজসেবার কাজে ব্যয় করার পাশাপাশি সহৃদয় মানুষের সহযোগিতাও তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে হেল্পিং হ্যান্ডের ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করেন সমাজসেবী পিনাকী গাঙ্গুলি। সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। তরুণ প্রজন্মের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, নিজেদের পেশার পাশাপাশি সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি পিনাকী বাবু ভূয়সী প্রশংসা করেন এই উদ্যোগের । শুধু প্রদর্শনী আয়োজন নয়, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও কাজ করছে হেল্পিং হ্যান্ড। অঙ্কিত মিত্র জানান, মানুষের বাড়িতে পড়ে থাকা পুরনো কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে সুন্দরবন ও শান্তিনিকেতনের মতো এলাকায় মডেল স্কুল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামের পড়ুয়াদের কম্পিউটার, ইংরেজি ও এআই শেখানোর পাশাপাশি আদিবাসী এলাকাতেও বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে।
ঝড়খালির বিরিঞ্চিবাড়ি হাইস্কুলকে মডেল স্কুল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খগেন্দ্রনাথ স্মৃতি স্কুলের সঙ্গেও কাজ চলছে। কোন্নগরের ‘বাঁশাই প্রচেষ্টা’র সঙ্গে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। তাঁদের খেলাধুলার সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি স্পেশ্যাল অলিম্পিকসে অংশগ্রহণেও সহযোগিতা করা হয়।
টালিগঞ্জের রামকৃষ্ণ ভাবাদর্শ শিক্ষা প্রাঙ্গণ ও বিভিন্ন বস্তি এলাকাতেও হেল্পিং হ্যান্ডের সামাজিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। প্রায় ৩০০–৪০০ মহিলার মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, কারিগরি শিক্ষা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ইংরেজি শিক্ষা, পড়াশোনায় সহযোগিতা, নীতিশিক্ষা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রসারের মতো কাজও চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
‘নুমাঈশ ২০২৬’-এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন শিল্পী ও ক্ষুদ্র উদ্যোগীদের নিজেদের তৈরি সামগ্রী তুলে ধরার সুযোগ মিলেছে, তেমনই প্রদর্শনী থেকে সংগৃহীত অর্থ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে হেল্পিং হ্যান্ড। তরুণ সদস্যদের সম্মিলিত উৎসাহ ও উদ্যোগেই এবারের প্রদর্শনী পেয়েছে অন্য মাত্রা।সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে এ উদ্যোগের উদ্যোগীরা নিজেদের হাত বাড়িয়ে ,অন্যদের এগিয়ে দেননা, নিজেরাও এগিয়ে থাকেন।


