Sunday, June 23, 2024
সম্পাদকীয়

সেকুলারী দ্বিচারিতা: আধুনিক কালিদাসদের একটি জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ

————————————————————————–

সৌভিক দত্ত

=========

আমার জীবনে দেখা দুটো ঘটনা বলি।

১) একজন স্কুল টিচার। সিপিএম করে আর দিনরাত শুধু হিন্দুদের মুন্ডপাত করে। সমস্ত সাম্প্রদায়িক ঘটনায় হিন্দুদের দোষ খুঁজে বেড়ায়। তার ভাষায় কাসভ-আফজলরা নাকি কেউ খারাপ না। নেহাতই সঠিক শিক্ষা ও ভালোবাসা পেলে সবাই পালটে যাবে। তবে হিন্দুরা খারাপ। তাদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের জন্যই ওরা জঙ্গি হতে বাধ্য হয়। এমনকি দাঙ্গার ফুটেজ দেখালেও চোখ বন্ধ করে বলে দেয় যে ওটা আরএসএসেরই কাজ (ওদের কাছে আরএসএস-বিজেপি-সংহতি-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সবই এক), আরএসএস-বিজেপিরাই ছদ্মবেশ নিয়ে ওসব করছে দাঙ্গা লাগিয়ে বিজেপিকে ভোটে জেতার জন্য।

সেই পাবলিকের স্কুল ছিলো আবার সংখ্যালঘু এলাকায়। একবার এদিকে দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হওয়াতে ভদ্রলোক ভয়ে স্কুলেই গেলেন না তিনদিন, যদি হিন্দু বলে ওকে মেরে দেয়। বুঝলাম যে এলাকাবাসীদের যথেষ্ট শিক্ষা ও ভালোবাসা দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তার এই দোগলামি নিয়ে তাকে এত টিজ করতাম যে শেষ পর্যন্ত ব্লক করেই দিলো আমায়।

২) ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া একটা মেয়ে — তিনু। স্বাভাবিকভাবেই দিনরাত বিজেপিকে খিস্তায় ভারতে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর জন্যে। তার এক বন্ধুর থেকে শুনেছিলাম যে রাতে বাড়ি ফেরার সময় সামনে থাকা সংখ্যালঘু পাড়ার ভেতর দিয়ে না এসে মিনিট দশেক অতিরিক্ত সাইকেল চালিয়ে হিন্দু পাড়া ঘুরে আসে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে যে পাড়াটা ভালো না। কিন্তু কেন ভালো না, তা অবশ্য বলে না।

এমন অজস্র অজস্র উদাহরণ আমি জানি। আমায় যারা হিন্দুত্ববাদী অ্যাক্টিভিটিজ করতে বারণ করে, তাদের বেশিরভাগই এই কারণে বারণ করে না যে হিন্দুত্ববাদ খারাপ, বরং এই কারণে বারণ করে যে “ওরা” খুব সাঙ্ঘাতিক হয়। এসব করলে ওরা রেগে গিয়ে দাঙ্গাহাঙ্গামা বাঁধিয়ে দিতে পারে।

কেন বলছি এগুলো? কারণ আছে।

জ্যোতি বসুর পরিচয় নিশ্চয়ই নতুন করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই? নায়ক হিসাবে হোক বা খলনায়ক হিসাবে হোক‚ তাকে সমস্ত বাঙ্গালীই চেনে। আর ওনার জীবনের একটা মজার ঘটনা শেয়ার করি।

জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। সেই কমিউনিস্ট পার্টি যারা ১৯৪২-এই মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনের সাথে তাল রেখে পেশ করে অধিকারী থিসিস — সেই অধিকারী থিসিস, যেখানে ভারতকে জাতি-ধর্মের ভিত্তিতে ১৭ ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। মানে ওই বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় কেস আর কি!!! মুসলিম লীগ বলল ভারতকে দুই খন্ড (মতান্তরে তিন, জিন্নাহ পরবর্তীতে যাকে “টাইপিং এরর” বলে চালাবেন) করার প্রস্তাব দিলো। আর তাদের গেলমান কমিউনিস্টরা দিল একেবারে ১৭-১৮ খন্ড করার প্রস্তাব!

সেই কমিউনিস্ট পার্টি, যারা ১৬ ই আগস্টের গণ হিন্দু নিধনের আগে হিন্দুদের দুর্বল করতে ঘোষণা করে, “মুসলিম লীগ নেতারা যাই বলুন, মুসলিমরা কতটা ব্রিটিশবিরোধী, তা তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। অতএব এই দিন যদি কোনো বিপথগামী মুসলিম ঝোঁকের বসে কিছু একটা করে বসে, তবে তাকে আপনারা ভাইয়ের একটা ভুল বলেই মেনে নেবেন।” — স্বাধীনতা, ১৩ আগস্ট, ১৯৪৬।

এছাড়াও কমিউনিস্ট নেতা অমর মুখার্জী ও মংরু টাটোয়া বালিতে একটি জুটমিলের গেটে আয়োজিত সভায় শ্রমিক ও বালি দোকানদারদের রীতিমত হুমকি দিয়ে বলেন যে ১৬ ই আগস্টে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতেই হবে, নচেৎ ফল খারাপ হবে। এছাড়াও মেটিয়াবুরুজের লিচুবাগান বস্তিতে আটকে পড়া হতভাগ্য ওড়িয়াদের গণহত্যায় স্থানীয় কমিউনিস্ট নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ ফারুকী প্রমুখ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

[Source: গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংসে লাখো হিন্দুর হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন জানিয়েছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টরা; ময়ুখ দেবনাথ ]

প্রসঙ্গত এই ফারুকী পরে সিপিআইএমের টিকিটে জিতে বিধায়কও হয়।

কম্যুনিস্ট নেতা ও অধ্যাপক ডঃ কল্যাণ দত্ত তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে খিদিরপুরে ১৯৪৬ সালের ১৬ ই আগস্ট হিন্দু কমিউনিস্ট কর্মীরা তাদের মুসলিম কমরেডদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। কমিউনিস্ট টেক্সটাইল ইউনিয়নের নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ ফারুকী এবং মুসলিমদের সাথে কট্টরপন্থী এলিয়ান মিস্ত্রি কলকাতার খিদিরপুরের নিকটবর্তী লিচুবাগান বস্তিতে কসোরাম কটন মিলগুলিতে একটি সশস্ত্র মুসলিম ব্যান্ডের নেতৃত্বে ছিলেন।

হিন্দু কমিউনিস্টরা এসব দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। তারা তাদের মুসলিম কমরেডকে দলের সদস্যপদ কার্ড দেখিয়ে তাদের কাছে নিজের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল, যদিও তাদের জীবন অবশ্য বাঁচেনি।

[Source: ঐ ]

আবার সিপিআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পি সি যােশী ২৭ শে আগস্ট, ১৯৪৬ সালে বাঙ্গালার কমরেডদের উদ্দেশ্যে যে চিঠি দিয়েছিলেন, তার অংশ বিশেষ হলো, ”We can vote against the Muslim League Ministry PROVIDED IT DOES NOT EFFECT OUR MUSLIM WORKING CLASS BASE and we can carry it with ourselves through our intensive explanatory campaign. If we cannot keep up even our hold on existing organised working class, everything is lost, even for the future. Thus the best way possible to keep all in good humour was to stay neutral. Voting against the Muslim League will have other serious implications ………”

অর্থাৎ সোজা ভাষায় মুসলিম ওয়ার্কিং ক্লাসকে চটানাে যাবে না। তাই পার্টি লিগের বিরুদ্ধে ভোট দান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছে!

[Source:
i) বাম মিথ্যাচারকে ইতিহাস বলবেন না কমরেড শতরূপ ঘোষ; সুতীর্থা মুখার্জী
ii) sickle and crecent,communist and league, Somya Basu]

আবার ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম এবং কমিউনিস্ট নেতা নিখিল চক্রবর্তী একসঙ্গে মুসলিম লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারও লেখেন, যার নাম ছিলো ‘LET US GO TO THE WAR’।

[Source: Brothers against British Raj]

এমনকি ১৬ ই আগস্ট কলকাতায় হিন্দু গণহত্যার দিন দুপুর ৩ টের সময় অক্টারলোনি মনুমেন্ট (শহীদ মিনার)-এর তলায় মুসলিম লীগের যে মিটিং হয়‚ যে মিটিং থেকেই দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে আর কি‚ শোনা যায় তাতে নাকি খোদ জ্যোতি বসুও উপস্থিত ছিলেন।

[Source: ৪৬-এ হিন্দু নরমেধ যজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী জ্যোতি বসু ও বর্তমান কমরেড সমাজ — ঋদ্ধিমান রায়। ]

তা যাই হোক‚ যে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে পাকিস্তানপন্থীদের এত মাখোমাখো সম্পর্ক ছিলো‚ সেই কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু মুসলিম লীগের দেশ পাকিস্তানে না থাকার জন্যে কি করেছিলেন জানেন?

বঙ্গীয় বিধানসভায় পাকিস্তান ভেঙ্গে হিন্দুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির প্রস্তাবে যারা ভোট দিয়েছিল‚ সেই লিস্টটা দেখুন, কমরেড জ্যোতি বসুর নামটা এখনও জ্বলজ্বল করছে।

এবং পরবর্তীতে অবশ্যই জ্যোতি বসু হিন্দুবিরোধী কমিউনিস্ট কাজকর্ম চালিয়ে গিয়েছেন, যার আমলেই সংগঠিত হয়েছিল মরিচঝাঁপির মত দলিত গণহত্যা‚ বিজন সেতুর মতো হিন্দু সন্ন্যাসী গনহত্যা‚ যার আমলেই রামকৃষ্ণ মঠ রাষ্ট্রীয় অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে হিন্দু পরিচয় পর্যন্ত ছেড়ে দিতে চায়। কারণ তারা জানত যে কমিউনিস্টদের যাবতীয় রাগ হিন্দুদের বিরুদ্ধেই।

সে যাই হোক‚ যেখানে ছিলাম সেখানে আসি। জ্যোতি বসু ভালো করেই জানতেন যে সেক্যুলারি রাজনীতি‚ কমিউনিস্ট রাজনীতি‚ ধর্মহীনতার ভণ্ডামি আঁতলামি — এসব করার জন্য হিন্দুপ্রধান এলাকা চাই! নেকড়ে প্রধান এলাকায় এসব করতে গেলে পিটিয়ে ছাল তুলে দেবে, বাংলাদেশে কমিউস্টদের সাথে ইতিমধ্যেই যেটা হয়েছে। কমিউনিস্ট নেতা তাহেরের সাহায্যে ক্ষমতায় এসে সেই তাহেরকেই দলবলসুদ্ধ নিকেশ করে দিয়েছে ইসলামিস্টদের চোখের মণি জিয়াউর রহমান। ওদেশে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা এখন হজ্ব করতে যায়। ইয়ার্কি করছি না!!! সত্যিই বলছি। ২০১৪ সালে হজ্ব পালনে যান জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। আর ২০১৭ সালে হজ্ব করে আসেন কমিউনিস্ট নেতা মনজুরুল আহসান খান।

আর শুধু তো জ্যোতি বসুই না। বেসিক্যালি আঁতলামি করা সব কমিউনিস্ট-লেফটিস্ট কিংবা সেকুলাররাই জানে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যে হিন্দু প্রধান এলাকার বিকল্প কিছুই নেই। এরা থাকতেও চায় সেই হিন্দুপ্রধান এলাকায়। জানে মেরে ফেললেও এরা অন্য কোথাও গিয়ে বাড়ি বানাবে না। বাড়িতে মেয়ে বউ থাকলে তো অবশ্যই না।

কিন্তু আঁতলামি করার জন্যই হোক কিংবা পকেটে দুই পয়সা ইনকামের জন্যই হোক দিনরাত চেঁচিয়ে যাবে সব ধর্ম সমান‚ হিন্দুরা অসহিষ্ণু‚ হিন্দুরাষ্ট্র মুর্দাবাদ বলে। সবসময়ই হিন্দুত্ববাদীদের খিস্তিয়ে যাবে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর অভিযোগে। অথচ নিজেরাও ভালো করেই জানে যে বাস্তবতা আসলে কী, যে কারণেই তো জ্যোতি বসুর ভোট পড়ে বাঙ্গালী হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ তৈরির পক্ষে। কিন্তু সেই কথা মুখ ফুটে কোনোদিন স্বীকার করবে না এরা।

কি অদ্ভুত আত্মহননকারী মনোবৃত্তি!!!

(লেখক- সৌভিক দত্ত। মতামত লেখকের নিজস্ব)