Saturday, July 11, 2026
Latestরাজ্য​

কপালে তিলক, গলায় তুলসির মালা; স্কুলছাত্রীকে TC স্কুলের, চাপের মুখে ওই ছাত্রীকে ফেরাতে বাধ্য হলো কর্তৃপক্ষ

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের পর এবার বিতর্কের মুখে পুরুলিয়ার পাড়া গার্লস হাইস্কুল (উচ্চ মাধ্যমিক)। কপালে তিলক কেটে এবং গলায় তুলসির মালা পরে বিদ্যালয়ে আসায় একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে জেলাজুড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তর সরাসরি হস্তক্ষেপ করে জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শকের কাছে রিপোর্ট তলব করে। অবশেষে প্রশাসনিক চাপে পড়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্রীর টিসি প্রত্যাহার করে তাকে পুনরায় ভর্তি নিতে বাধ্য হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও ছাত্রীর অভিযোগ

অভিযোগ, বিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুমনা মাজি গুরুদেবের কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর থেকেই কপালে লম্বা তিলক কেটে এবং গলায় তুলসির মালা পরে স্কুলে আসছিল। পরিবারের দাবি, গত এক বছর ধরেই এই ধর্মীয় আচারের কারণে সুমনাকে বিভিন্নভাবে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছিল। সম্প্রতি সকালের প্রার্থনা চলাকালীন সমস্ত ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিকাদের সামনে প্রকাশ্যে সুমনার কপালের তিলক মুছে দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে এভাবে স্কুলে না আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই ঘটনায় চরম অপমানিত বোধ করে ওই ছাত্রী। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই মানসিক অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে সুমনা আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিল। সুমনার আরও অভিযোগ, শুধু তাকেই নয়, তার সহপাঠী অনুপমা বাউরির সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করা হয়েছে এবং তাদের গুরুদেবকে নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রতিবাদের জেরে টিসি ও সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ

মেয়ের ওপর হওয়া এই আচরণের প্রতিবাদ জানাতে স্কুলে যান সুমনার মা বাসন্তী মাজি। তাঁর অভিযোগ, এই প্রতিবাদের জেরেই স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সুমনার ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) পাঠিয়ে দেয়। ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

বিষয়টি রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তরের নজরে আসায় তারা দ্রুত পদক্ষেপ করে এবং জেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শকের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চায়। গত বুধবার জেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক মহুয়া বসাক স্বয়ং বিদ্যালয়ে তদন্তে যান। পরে তিনি জানান, “স্কুল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই টিসি প্রত্যাহার করেছে এবং নতুন করে ছাত্রীর নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রীর পড়াশোনায় যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তা আমরা নিশ্চিত করছি।”

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

ছাত্রীর মা বাসন্তী মাজি ইতিমধ্যেই মেয়ের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানার অভিযোগে পাড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এটি শুধুমাত্র স্কুলের নিয়মের প্রশ্ন নয়, বরং ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতারও প্রশ্ন।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার নির্যাতিতা ছাত্রীর বাড়িতে যান পাড়ার বাসিন্দা তথা রাজ্যের পূর্ত ও অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউরি। তিনি ছাত্রীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, “কপালে তিলক কেটে বা গলায় তুলসির মালা পরে কেউ স্কুলে আসতেই পারেন। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস। যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত মিটে যাবে।” অন্যদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলও।

স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বিতর্কের মুখে পড়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুস্মিতা ঘোষ বলেন, “স্কুলের একটি নিয়মশৃঙ্খলা রয়েছে, যা সকলকেই মানতে হয়।”