রাশিয়া থেকে ভারতে সরাসরি রেলপথ তৈরির প্রস্তাব দিল মস্কো
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে অস্থিরতা ও বাধার ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া থেকে ভারতে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন জানিয়েছেন, ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেলপথ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা উচিত। তাঁর মতে, সমুদ্রপথে কোনও ধরনের সংকট তৈরি হলে বিকল্প স্থলপথের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
খুসনুলিন বলেন, বসফরাস ও হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ঝুঁকি বাড়লে বিকল্প রুট বিবেচনা করতে হবে। তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতে পৌঁছনোর বিভিন্ন সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য যে কোনও কার্যকর বিকল্পই গ্রহণযোগ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বসফরাস প্রণালী কৃষ্ণসাগরকে মারমারা সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এটি তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের জেরে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে, ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালীও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশ, ভারতও যার মধ্যে রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার তেলের উপর আরও বেশি নির্ভর করছে। বর্তমানে চিনের পর রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক হয়ে উঠেছে ভারত। গত মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছয় এবং দেশের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও দ্রুত বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছনোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ভারত বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার পথ খুঁজতে রাশিয়ার নর্দার্ন সি রুট নিয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে।
রাশিয়া-ভারত সরাসরি রেল যোগাযোগের ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে রাশিয়া ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (INSTC) ব্যবহার করে ইরানের মধ্য দিয়ে দুটি ট্রেন বোঝাই কয়লা ভারতে পাঠিয়েছিল। তবে বর্তমানে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলিকে ঘিরে সামরিক পরিস্থিতির কারণে ওই রুট ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে ইরানের পূর্বাঞ্চল হয়ে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতে পৌঁছনোর রুট বিবেচনা করা যেতে পারে।
আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে উজবেকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে। ট্রান্স-আফগান রেলপথ প্রকল্প ভবিষ্যতে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। এই পথ ব্যবহার করা গেলে ইরানের দক্ষিণাঞ্চল এড়িয়ে ভারতে স্থলপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই ধরনের রেল যোগাযোগ বাস্তবায়নে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত টানাপোড়েন এই প্রকল্পের পথে বড় বাধা হতে পারে। একইসঙ্গে চিনও রাশিয়া-ভারত রেলপথের উন্নয়নকে সমর্থন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, পাকিস্তানে চিনের তৈরি রেল ও পরিবহন পরিকাঠামোর সঙ্গে ভবিষ্যতে এই রেলপথকে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে, বিশেষ করে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (CPEC)-এর বিদ্যমান পরিকাঠামোর সঙ্গে।
রাশিয়া ও চিন যদি ইউরেশিয়া জুড়ে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহের বিকল্প স্থলপথ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

