‘ভালো থেকো জ্যাক, আবার ফিরে এসো’
মানুষের সঙ্গে যে প্রাণীটির সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব, সেটি হল কুকুর। কুকুরের প্রভুভক্তি কিংবা মানুষের সঙ্গ ধরে রাখার বহু গল্প-কাহিনী রয়েছে। তেমনই একটি কাহিনী তুলে ধরেছেন ভবানীপুরের সিতেশ দাস। তাঁর ফেসবুক থেকে লেখাটি হুবুহ তুলে ধরা হলো-
ভালো থেকো জ্যাক…
১৩ জুন, ২০২১
যখন এটা লিখছি তখন সময় ঠিক বিকাল ৬টা।
ঠিক ৫ মিনিট আগেই জ্যাকের দেহ সৎকার করে এল বন্ধুরা। কিছুদিন যাবৎ শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না জ্যাকের। পাড়ার মানুষজন মিলে চেষ্টা করেছিল সারিয়ে তোলার, কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
জ্যাক ছোট থেকেই বেশ নাদুসনুদুস ছিল, যত বড় হতে থেকে চেহারাটা ছোট সিংহের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। পাড়ার মানুষজন তো বটেই, অন্য পাড়া এমনকি বাইরের লোকেরা যারা জ্যাককে দেখেছে একবার হলেও, তারা ভুলতে পারেনি।
মিষ্টি খুব প্রিয় ছিল জ্যাকের, বিশেষ করে রসগোল্লা।
প্রতিদিন দুপুরে ও রাতে একটা করে মিষ্টি ঠিক পেয়ে যেত সে। পাড়ার মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মিষ্টির দোকান থেকে একটা রসগোল্লা চলে আসতো শালপাতার বাটি করে। নিজের হাতে করে খেতে পারতো না, আর মেঝেতে রেখে দিলেও খেত না। ওকে খাইয়ে দিতে হতো নিজের হাতে করে।
আজ থেকে ৩/৪ বছর আগে পাড়ায় যদি কোনো বিয়ের বাড়ি হত, আর বরযাত্রী/কনেযাত্রী যখন যেত পাড়া থেকে ওকে নিয়ে যাওয়া হত না। স্বাভাবিক কারণেই নিয়ে যেত না, কিন্তু সেই না নিয়ে যাওয়ার দরুন সে একবার দ্বিতীয় হুগলি সেতু অব্দি একাই চলে গেছিল বাসের পেছন পেছন, পরে রাস্তায় তাকে দেখতে পেয়ে তুলে নেওয়া হয় বাসে। তারপর থেকে পাড়া থেকে বড় পিকনিক/বিয়ে বাড়ির বাস ছাড়লে ওকে নেওয়া হত, না হলে সারাদিন পাড়ার মুখে বসে বা শুয়ে কাঁদতো, তবু কারোর উপর রেগে যেত না কখনো।
জ্যাক… হ্যাঁ সবার প্রিয় একজন।
আমাদের ক্লাবের যখন কোনরকম আলোচনা সভা হত, ঠিক চলে আসতো। চুপ করে বসে পুরোটা শুনতো, শেষ হলে চলে যেত।
আমরা মাঠে খেলতে গেলে, ঠিক আমাদের সাথে যেত।
আজ পর্যন্ত আঘাত করেনি কাউকে, অকারণে চেঁচামেচি করেনি, রেগে যায়নি।
পাড়ার কেউ মারা গেলে শববাহী গাড়ি বা ম্যাটাডোরের পিছন পিছন চলে যেত শ্মশানে। মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে সবসময় নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রাখতো নিজেকে।
আমার বাড়ির সামনে একটা বড় দইয়ের খালি হাঁড়ি রাখা থাকতো, আর মা রোজ জল দিয়ে দিত। জ্যাক যখনই পাড়া ঘুরে এসে হাঁপিয়ে বাড়ির সামনে আসতো, তখন জল খেত ওখান দিয়ে। কত আদর করেছে সবাই, কত যত্ন করেছে সবাই। শীতকালে জামা পড়ানো থেকে গরমে স্নান করানো, একটা ছোট লেপ বা আলুর বস্তা শীতকালে দেওয়া হত তার গায়ে। বৃষ্টি পড়লে কারোর বাড়িতে ঠিক এসে পড়তো, একটু বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
ওকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, পাশের পাড়ার এক কাক আমার চোখ মুছতে মুছতে করুণ গলায় বললো,
“ভগবান ভুল করে ওকে এই জন্ম দিয়েছে, আগের জন্মে কি এমন করেছিল, যাতে ওকে মানুষ হতে দিল না?! “
আমি তখন একটা কথাই ভাবলাম, মানুষ করেনি বলেই বোধহয় এত ভালোবাসা পেল, ভালো জিনিসের দরকার ভগবানের সবার আগে পড়ে, তাই ভগবান জ্যাককে নিয়ে নিল।
ভালো থেকো জ্যাক,
আবার ফিরে এসো।
জ্যাক (২০০৭-২০২১)।
শ্রদ্ধা নিবেদনে- নেতাজী বালক সঙ্ঘ (ভবানীপুর)।

গুরুদাস কলেজ থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে ডিজিটাল সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত।

