Monday, May 27, 2024
সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী কালী মন্দির

সংগ্রাম দত্ত:

—————-

বাংলাদেশের সুপ্রাচীন মন্দির গুলোর মধ্যে চট্টলেশ্বরী বা চট্টেশ্বরী কালী মন্দির অন্যতম। 

বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহরের এই দেবী চট্টেশ্বরী নামে ভক্তদের মাঝে সমাদৃত ।

 দেবী চট্টেশ্বরীর মন্দির চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির। জনশ্রুতি মতে, আনুমানিক ৩০০-৩৫০ বছর পূর্বে আর্য মুনি ঋষি ও সাধু সন্যাসীদের মধ্যে চট্টেশ্বরী দেবীর প্রকাশ ঘটে। চট্টগ্রামে এই দেবীর নামে নামাঙ্কিত সড়ক চট্টেশ্বরী রোডে তিনটি পাহাড়ের কোনে অবস্থিত এই মন্দির। সড়ক থেকে কিছুটা উঁচুতে একটি টিলার উপর স্বমহিমায় বিরাজ করছেন দেবী চট্টশ্বরী। 

সিড়ি ভেঙ্গে মন্দিরের প্রবেশ দ্বার পেড়িয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতেই বামদিকে দেবী মন্দির। ডান দিকে ভৈরব রূপী মহাদেবের মন্দির। দেবী এখানে দক্ষিণাকালী রূপে পূজিতা হন । দেবীর ভৈরব হলেন চন্দ্রশেখর। অনেকের মতে এটি একটি সতিপীঠ । এখানে দেবী সতীর দক্ষিণ বাহু পতিত হয়েছিল। অবশ্য এই বিষয়ে যথেষ্ট মত বিভেদ রয়েছে। তবে সতীপীঠ হোক আর নাই হোক। চট্টগ্রামবাসীদের কাছে দেবী চট্টেশ্বরী সদা জাগ্রত ও মমতাময়ী মা।

এই মন্দিরের প্রথম দেবী বিগ্রহ নিয়ে কংবদন্তী রয়েছে। এখানে বর্তমানে যে বিগ্রহটি রয়েছে সেটি মুল বিগ্রহ নয়। মন্দিরের সেবায়েতদের মতে দেবী একজন ভক্ত সাধক রাম সুন্দর দেবশর্মনকে সপ্নাদেশ দেন তাঁর শীলামূর্তি উদ্ধারকরে নিত্যপূজার ব্যবস্থা করতে। মায়ের আদেশে রামসুন্দর মন্দিরের সামনে থাকা পুষ্করিনী থেকে দেবীর শীলামূর্তি উদ্ধার করেন। তৎকালীন এক জনৈক মহারাজ মায়ের নিম কাঠের মূর্তি তৈরি করে দেন। শুরু হয় নিত্যপূজা। কথিত আছে কবি নবীন চন্দ্র সেন নাকি সাধক রামসুন্দরকে নিত্যপূজার জন্য ৫০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। চারদিকে প্রচার হতে লাগলো দেবী চট্টেশ্বরীর মহিমা। ভক্তদের সহযোগিতায় তৈরি হল পাকা মন্দির। দেবী হয়ে উঠলেন চট্টগ্রামবাসীর পরম আরাধ্যা। সোনা ও রূপোর অলঙ্কারে সেজে উঠল দেবী বিগ্রহ। প্রতিদিন ভক্তদের ভিড় হতে লাগল। 

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রক্কালে পাক বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয় এই মন্দির। অর্থ আর সোনা দানা লুট করে হনাদাররা মায়ের নিমকঠের বিগ্রহটি ভেঙে ফেলে দেয়। সেবায়েতদের বাড়িঘর ও মন্দির ব্যপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। নিম কাঠের বিগ্রহটির যেসব অংশ উদ্ধার করা গিয়েছিল সেগুলো জোড়া দেয়া সম্ভব হয়েছিল। সেই ভাঙা বিগ্রহেই কিছুদিন পূজা হয়। তারপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে মন্দিরের সেবায়েত ডাঃ তারাপদ অধিকারী তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বাণিজ্যমন্ত্রী তরুণ কান্তি ঘোষ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সহযোগিতায় শ্বেতপাথরের সদাশিবের উপর দন্ডায়মান কষ্টিপাথরের চর্তুভূজা দক্ষিণাকালী মায়ের বিগ্রহ তৈরি হয়। এতে বাংলাদেশ সরকার ও প্রত্যক্ষ ভাগে সহযোগিতা করে। আজও এই মূর্তিতেই পূজিতা হন দেবী চট্টেশ্বরী। কষ্টিপাথরের বিগ্রহটির বাম দিকে সিংহাসনে রয়েছে সেই ভাঙা নিম কাঠের বিগ্রহ। আর ডান দিকে পুষ্করিনী হতে উদ্ধারকৃত শীলামূর্তি। বহু লোক গাঁথা ও জনশ্রুতির মধ্যদিয়ে দেবী চট্টেশ্বরী ভক্তদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন আর তাদের এই ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে এই সুপ্রাচীন মন্দিরটি স্বমহিমায় দাড়িয়ে রয়েছে।