Thursday, May 23, 2024
সম্পাদকীয়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ~ “উপরের তলার চক্রান্ত”

সংগ্রাম দত্ত: স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র চন্দ্র ঘোষ কে কার্যত অপসারিত হতে হয়েছিল দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরদের বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করতে এই রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রভাবশালী সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিল দিল্লির রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা।

একজন গান্ধীবাদী মানসিকতার মানুষ হয়েও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মত কে উপেক্ষা করেছিলেন।তাঁর মতামত কে মান্যতা দিয়ে নিজের মন্ত্রী সভায় মাড়োয়ারী সমাজের মানুষ কে সদস্য করতে রাজি হননি। অর্থাৎ সামগ্ৰিক ভাবে তিনি সেদিন দিল্লির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে প্রভাবশালীদের তীব্র চাপেও মাথা নোয়ান নি। ফলস্বরূপ তাঁকে অপদস্থ করা ও পদ থেকে অপসারিত করার সলতে পাকানোর পর্ব শুরু হয়েছিল যখন তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন মনোভাব বজায় রাখলেন।

উল্লেখ্য একটু চমকে যাওয়ার মত তথ্য হল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১৯৪৭-এর ২১ নভেম্বর বেলা দুটোয়। তার কার্যবিবরণের নথি ঘাঁটলেই দেখা যাবে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ উল্লিখিত হচ্ছেন ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ বলে। আর তাঁর পরে প্রধানমন্ত্রী হন বিধানচন্দ্র রায়। ১৯৫২-এর ২৬ জানুয়ারি ‘প্রধানমন্ত্রী’ কথাটা পরিবর্তন করে করা হল ‘মুখ্যমন্ত্রী’। সে দিনই, সরকারি ভাবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ‘মুখ্যমন্ত্রী’ হলেন বিধানচন্দ্র রায়।

কেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ মাড়োয়ারী সমাজের কাউকে নিজের মন্ত্রী সভায় সদস্য করতে রাজি হলেন না!

নেপথ্যের কারণ কী? ১৯৪৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রফুল্লচন্দ্র চন্দ্র ঘোষ পদত্যাগ করেছিলেন। ২১ জানুয়ারি ডাঃ বিধান রায় কংগ্রেস পরিষদীয় নেতা নির্বাচিত হন।

প্রফুল্লচন্দ্র চন্দ্র ঘোষ অবশ্যই গা্ন্ধীবাদী মানসিকতার মানুষ কিন্তু সততা ও অন্যান্য অনেক গুণের জন্য তিনি অবশ্যই স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের অফিসের গাড়িতে তাঁর ভাগ্নী কে পর্যন্ত চড়তে দিতেন না। তাঁকে কার্যত অপসারণ করা হয়েছিল। তিনি বাধ্য হয়েছিলেন পদত্যাগ করতে।

উত্তর কলকাতার একটি তেল কলে কিছু ভেজাল জিনিস ধরা পড়ে। আইন মোতাবেক প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ কড়া ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। হজম হল না দিল্লির তখনকার প্রভাবশালী নেতা মন্ত্রী থেকে মাড়োয়ারী সমাজের মাতব্বরদের। তারা লেগে গেলেন প্রফুল্লচন্দ্র চন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে লবি করতে। এর নির্যাস হল প্রফুল্ল ঘোষ কে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং ডাঃ বিধান রায় কে মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে। 

দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই এমনি রে রে রব উঠেছিল প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে।মাড়োয়ারী সমাজের মাতব্বররা দিল্লিতে প্রভাব খাটানো শুরু করলেন এবং তাদের প্রথম দাবি হল মাড়োয়ারী সমাজের কোনও শাসক দলের ভক্ত কে মন্ত্রী করতে হবে। দিল্লির কংগ্ৰেসের বড় মাপের নেতারা সেই দাবিতে গলে জল।খোদ গান্ধী মাড়োয়ারীদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাঁর সন্মতি দিয়ে ছিলেন। তবে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ ছিলেন দৃঢ় চরিত্রের মানুষ। তিনি গান্ধীজি সহ নেতাদের সব অনুরোধ, সুপারিশ উপেক্ষা করলেন। তখনই তৈরি হয়েছিল প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ কে সরিয়ে দিয়ে ডাঃ বিধান রায় কে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানোর নীল নকশা।

আর সেই বিষয় নিয়ে বিখ্যাত বাংলা সংবাদপত্র “যুগান্তর”পত্রিকার নির্ভীক সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় লিখলেন সম্পাদকীয় “উপরের তলার চক্রান্ত”।ব্যাস আগুন জ্বলে উঠলো। সকালে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে টেলিফোন বেজে উঠল ক্রিং করে। তিনি টেলিফোন ধরতেই ওপার থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হল আমি বিধানচন্দ্র রায় বলছি-“ক্যাপ্টেন নরেন কোথায়”? তিনি তখন যুগান্তর পরিচালক মন্ডলী তথা ডাইরেক্টের বোর্ডের চেয়ারম্যান। সত্যি সত্যি প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ পদত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর জায়গায় নতুন মুখ্যমন্ত্রী হলেন বিধান রায় যিনি উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল হতে রাজি হননি।