স্থানীয় মুদ্রা রুপি-ইয়েনে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিকল্পনা করছে ভারত-জাপান
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ১৬তম দ্বিপাক্ষিক বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রথমবার ভারত সফরে এসেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। রাজধানী দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর এই বৈঠকটি বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা। আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদী জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে ‘ছোট বোন’ এবং ‘দূরদর্শী ও জনপ্রিয় নেত্রী’ বলে সম্বোধন করেন। এই সফরের সমান্তরালে দু’দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের এক নতুন সমীকরণ উঠে এসেছে।
রুপি-ইয়েন লেনদেনের পরিকল্পনা: ডলার-নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
জাপানি সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত ও জাপান এখন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের স্থানীয় মুদ্রা তথা রুপি ও ইয়েনে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে। যদিও বৈঠকের পর এই বিষয়ে সরকারিভাবে এখনও কিছু ঘোষণা করা হয়নি, তবে এর নেপথ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে:
মুদ্রার অবমূল্যায়ন রোধ: মার্কিন ডলারের তুলনায় রুপি এবং ইয়েন—উভয় মুদ্রার দরপতন দু’দেশের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগের সরলীকরণ: এই ব্যবস্থা চালু হলে জাপানি অনাবাসীরা ভারতীয় ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পাবেন, যা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও শিল্পক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিয়োগ আরও সহজ করবে।
আরবিআই-এর ভূমিকা: ২০২৫ সালের ‘জাপান-ইন্ডিয়া ভিশন’-এ এই প্রস্তাবটি প্রথম উত্থাপিত হওয়ার পর থেকেই আলোচনা চলছে। ভারতের পক্ষে এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI)।
ইন্দোনেশিয়া মডেলের সাফল্য: ২০১৯ সাল থেকে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করে ২০২৫ সালের মধ্যে জাকার্তায় বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৭০ কোটি ডলারে নিয়ে গেছে জাপান। বর্তমানে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও একই বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে তাকাইচি প্রশাসন। চিন, রাশিয়া, ইইউ এবং উপসাগরীয় দেশগুলির মতো ভারত-জাপানও এখন ডলার-মুক্ত বাণিজ্যের পথে হাঁটছে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কৌশলগত জোট এবং ‘মোগামি’ চুক্তি
বেজিংয়ের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে গত কয়েক বছরে চিন-জাপান সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। তাইওয়ান সংকটকে কেন্দ্র করে জাপান তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও মজবুত করতে চাইছে টোকিও।
মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট: বৈঠকের পর দু’দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সূত্রের খবর, জাপানি প্রযুক্তির ‘মোগামি’ শ্রেণির স্টেলথ ফ্রিগেট বা রণতরী যৌথ উদ্যোগে ভারতের মাটিতে তৈরি করতে জাপানের কোনো আপত্তি নেই।
ভারতীয় অস্ত্রের বাজার: আগামী দিনে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে ভারতের তৈরি ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ‘আকাশ’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কিনতে পারে জাপান।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা: যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদী সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তি জোরদার করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন, যা যৌথ অস্ত্র নির্মাণ প্রকল্পেরই ইঙ্গিত দেয়।
ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দু’দেশই একে অপরের পরিপূরক হতে চলেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতের বৈশ্বিক আধিপত্য এবং সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ গবেষণা ও পরমাণু জ্বালানিতে মোদী সরকারের বাড়তি নজর এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
তাকাইচি তাঁর বিবৃতিতে আগামী ১০ বছরে ভারতে ১০ লক্ষ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রযুক্তির উন্নয়নেও দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কয়েক বছরে ভারতের মাটিতে জাপানি সংস্থার সংখ্যা দ্বিগুণ হবে।
আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু রুপি-ইয়েন লেনদেনের চূড়ান্ত অনুমোদন:
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির এই নিবিড় মেলবন্ধনের মাঝে দাঁড়িয়ে এখন মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু রুপি-ইয়েন লেনদেনের চূড়ান্ত অনুমোদন। জি৭ ভুক্ত দেশ জাপানের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান যে কয়েক গুণ শক্তিশালী হবে, তা বলাই বাহুল্য।

