দিল্লি বিস্ফোরণ কাণ্ড: পলাতক চিকিৎসক মুজাফফর আহমেদ রাথারকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করল NIA
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দিল্লির লালকেল্লার কাছে ভয়াবহ গাড়ি বোমা (ভিবিআইইডি) বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চার্জশিট পেশ করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন একজন পলাতক শিশু বিশেষজ্ঞ (পিয়াডিট্রিশিয়ান), যার বিরুদ্ধে আল-কায়েদা অনুমোদিত একটি জঙ্গি মডিউল প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। ওই বিস্ফোরণে ১১ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
নয়াদিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টের বিশেষ এনআইএ আদালতে এই অতিরিক্ত চার্জশিটটি জমা দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে লালকেল্লা বিস্ফোরণ মামলায় মোট চার্জশিটভুক্ত অভিযুক্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩। এর মধ্যে রয়েছে মূল অভিযুক্ত চিকিৎসক উমর উন নবীও, যে বিস্ফোরক বোঝাই গাড়িটি চালাচ্ছিল এবং ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
নতুন অভিযুক্তদের পরিচয়
এনআইএ সূত্রের খবর, নতুন যে তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, তাঁরা হলেন:
ডাঃ মুজাফর আহমেদ রাথার (ওরফে ফারাজ/জাফর): পেশায় এমবিবিএস এবং এমডি ডিগ্রিধারী শিশু বিশেষজ্ঞ। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি আল-কায়েদার শাখা সংগঠন ‘আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ অন্তর্বর্তী’ (AGuH Interim)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং লালকেল্লা হামলার মূল ষড়যন্ত্রকারী। তিনি বর্তমানে পলাতক।
জমির আহমেদ আহাঙ্গার: জঙ্গি মডিউলটির ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার (OGW) হিসেবে কাজ করতেন।
তুফায়েল আহমেদ ভাট: নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার (LeT) প্রাক্তন ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার, যিনি এই মডিউলের অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
ধৃত ও অভিযুক্ত এই তিনজনই জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দা। পলাতক চিকিৎসক মুজাফরের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই জামিন অযোগ্য পরোয়ানা (NBW) জারি করা হয়েছে।
ফরিদাবাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিস্ফোরক তৈরি
এনআইএ-র তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। হরিয়ানার ফরিদাবাদের আল-ফালাহ ইউনিভার্সিটির ভেতরে একটি গোপন আস্তানায় ট্রায়াসিটোন ট্রাইপেরক্সাইড (TATP) নামক মারাত্মক বিস্ফোরক তৈরি, পরীক্ষা এবং লুকিয়ে রাখার পেছনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল ডাঃ মুজাফরের। লালকেল্লার বিস্ফোরণে এই TATP বিস্ফোরকই ব্যবহার করা হয়েছিল।
তদন্তে জানা গেছে, ২০২২ সালের জুন মাসে শ্রীনগরের ইদগাহে একটি গোপন বৈঠকে এই ‘AGuH Interim’ সংগঠনটি তৈরি হয়। তুরস্ক হয়ে আফগানিস্তানে ঢোকার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এই দলের সদস্যরা নতুন করে সংগঠিত হয়েছিল।
উত্তরপ্রদেশ যোগ ও চিকিৎসকদের নেটওয়ার্ক
এই অতিরিক্ত চার্জশিটের ফলে মামলার উত্তরপ্রদেশ যোগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে গত ১৪ মে এনআইএ একটি ৭,৫০০ পাতার মূল চার্জশিট পেশ করেছিল, যেখানে উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের ডাঃ শাহীন সাঈদ এবং সাহারানপুরের ডাঃ আদিল আহমেদ রাথারের নাম ছিল।
প্রসঙ্গত, ধৃত ডাঃ আদিল হলেন পলাতক মূল ষড়যন্ত্রকারী ডাঃ মুজাফরের ছোট ভাই। বিস্ফোরণের ঠিক তিন দিন আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর সাহারানপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে আদিলকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, চিকিৎসকদের এই উচ্চশিক্ষিত ও উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কটি নিজেদের পেশাগত পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে জাল বিস্তার করেছিল।
অস্ত্র ও অর্থের লেনদেন
চার্জশিটে বাকি দুই অভিযুক্তের ভূমিকাও স্পষ্ট করা হয়েছে। জমির আহমেদ আহাঙ্গার মডিউলের হ্যান্ডলারদের সাথে যোগাযোগ রেখে টাকা এবং অস্ত্র পরিবহনের কুরিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। অন্যদিকে, তুফায়েল আহমেদ ভাট একটি ডেড-ড্রপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি একে-৪৭ রাইফেল, একটি ক্রিঙ্কভ রাইফেল, একটি পিস্তল এবং প্রচুর কার্তুজ জোগাড় করেছিলেন। এই অস্ত্রগুলি ৩ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিহত মূল অভিযুক্ত ডাঃ উমর উন নবীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
এনআইএ-র বক্তব্য: ফরেনসিক পরীক্ষা, জিও-লোকেশন ম্যাপিং, ডিজিটাল প্রমাণ এবং আর্থিক লেনদেনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এই আন্তর্জাতিক জঙ্গি মডিউলটির ছক ফাঁস করা হয়েছে। একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা এই উচ্চশিক্ষিত পেশাদারদের নেটওয়ার্কটি ভাঙতে তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও জারি রয়েছে।
তথ্যসূত্র: The Commune


