রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ, অথচ সীমান্তে ভিড় করা বাংলাদেশিদের ফেরত নিতে নারাজ ঢাকা
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছেন। ২০১৭ সালের আগস্টে মায়ানমারে শুরু হওয়া ব্যাপক সেনা অভিযানের সময় পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় করা বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত নিচ্ছে না কেন বাংলাদেশ সরকার?
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এরপরেই শত শত বাংলাদেশি সীমান্তে ভিড় করছেন। তাদের কাছে বাংলাদেশের জন্ম সনদ, ভোটার কার্ড-সহ বিভিন্ন কাগজপত্র রয়েছে। তবুও বাংলাদেশ সরকার তাদের ফেরত নিতে চাইছে না।
উল্লেখ্য, উন্নত জীবনযাপনের জন্য অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি দেওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল নয়। আমেরিকা থেকেও অবৈধ বসবাসকারীদের ধরে ধরে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় করা মানুষজন জানাচ্ছেন, ‘আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, বেআইনি ভাবে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছিলাম। বাংলাদেশে তাদের কারো কারো বাড়ি সাতক্ষীরা, কারো খুলনা, কারো বরিশাল অথবা চট্টগ্রাম-কুমিল্লা, ঢাকা প্রভৃতি জায়গায়।’
ভারতের ব্যারাকপুর, দমদম বা বারাসত, পার্ক সার্কাস, কেষ্টপুর, সোনারপুর-বারুইপুরে থাকতেন। কেউ ভাড়া বাড়িতে, কেউ পথের ধারে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকতেন। পুরুষেরা রাজমিস্ত্রির কাজ, কৃষিশ্রমিক, সবজি বিক্রি বা মার্বেলের মিস্ত্রির কাজ করতেন আর মহিলারা বাড়ি বাড়ি কাজ করতেন।
বিজেপি আসার পর ভারতে থাকাটা তাদের পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়েছে বলে জানাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সাফ জানিয়েছেন, নিজেরা চলে গেলে ভালো, এরপরে ধরা পড়লে জেলে ঢোকানো হবে। তাই আমরা ফিরে যাচ্ছি।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ ৮-১০ এমনকি ১৫-২০ বছর ধরে ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করেছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, ‘ভারতে কাজ করলে রোজগার বেশি। তাই অবৈধভাবে ভারতে এসেছেন। এখন NRC এর ভয়ে ফিরে যাচ্ছেন!’
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। গত এক সপ্তাহে অন্তত ১৫ হাজার ব্যক্তি সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে জড়ো হয়েছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। তাদের রাতের বেলায় হোল্ডিং সেন্টারে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে এবং খাবার ও পানীয় জলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনও তাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে রাজি নয়।
সূত্রের দাবি, সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অতিরিক্ত মোতায়েন করা হয়েছে। এমনকি ইদের দিন ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে শূন্যরেখায় পৌঁছেও বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে কয়েকজন ব্যক্তি নো-ম্যানস ল্যান্ডেই আটকে রয়েছেন।
বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তার বক্তব্য, ‘পুশ ইন’ বা জোর করে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর কোনও প্রচেষ্টাই মেনে নেওয়া হবে না। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সত্যিই বাংলাদেশি নাগরিক কি না, তা যৌথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রহণ করা হবে না বলেই স্পষ্ট জানিয়েছে ঢাকা।
অন্যদিকে ভারতের দাবি, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বহু ক্ষেত্রে তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তার উত্তর মেলে না। ফলে নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সীমান্তে আটকে থাকা হাজার হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চললেও এখনও কোনও স্থায়ী সমাধান সামনে আসেনি।


