ভারতকে বারবার হুমকি, রহস্যজনক মৃত্যু হলো ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ লিন্ডসে গ্রাহামের
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: মার্কিন রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, সাউথ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক প্রয়াণে ওয়াশিংটন তথা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য ও শোকের ছায়া। ৭১ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক গত ১১ জুলাই আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে সেনেটরের দফতর প্রথমে ধোঁয়াশা রাখলেও, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে—হৃৎপিণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী ফেটে যাওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে ইউক্রেন সফর থেকে ফেরার পরপরই তাঁর এই আকস্মিক অসুস্থতা ও মৃত্যু ঘিরে জল্পনা থামছে না।
ইউক্রেন সফর ও ট্রাম্পের সঙ্গে শেষ ফোনালাপ
জীবনের শেষ দিনগুলিতেও কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ এই সেনেটর। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আমন্ত্রণে সম্প্রতি কিভ সফরে গিয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটি ছিল তার দশম কিভ সফর। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগের সপ্তাহেও গ্রাহামের সঙ্গে তাঁর দু’বার বৈঠক হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রিয় বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিন্ডসেকে এক ‘প্রকৃত আমেরিকান দেশপ্রেমিক’ বলে অ্যাখ্যা দেন। সিএনএন-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন:
“গ্রাহাম যখন ইউক্রেন থেকে ফেরেন, সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। ও ভীষণ প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছিল, যদিও দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ও আমাকে ইউক্রেন সফরের দারুণ অভিজ্ঞতার কথা বলছিল। তার কিছু ক্ষণ পরেই সেখানে চিকিৎসকরা পৌঁছোন। আমি ভাবতেও পারিনি এমনটা ঘটবে। এটি এক ভয়ানক ক্ষতি।”
ভারত ও উদীয়মান অর্থনীতির ওপর ৫০০% শুল্কের হুঁশিয়ারি
লিন্ডসে গ্রাহাম বরাবরই রাশিয়া, ইরান ও চিনের কট্টর বিরোধী এবং ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক শক্তির আধিপত্য বজায় রাখার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আবহে গ্রাহাম এক চরমপন্থী অর্থনৈতিক অবস্থান নেন।
রাশিয়া থেকে সস্তায় খনিজ তেল আমদানি করার অপরাধে ভারত, চীন ও ব্রাজিলের ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক চাপানোর প্রস্তাব করেছিলেন তিনি। ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি মার্কিন কংগ্রেসে ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট অফ ২০২৫’ বিলটি উত্থাপন করেন।
যদিও এই বিলটি মার্কিন কংগ্রেসে পাস হয়নি, যার ফলে নয়াদিল্লি বড়সড় আর্থিক সংঘাত থেকে রক্ষা পায়। তবে এই বিল নিয়ে সংবাদমাধ্যমে গ্রাহামের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন:
* “ভারত, চিন ও ব্রাজিলকে বলব মস্কোর জ্বালানি কেনা বন্ধ করো। নইলে আমরা তোমাদের অর্থনীতি গুঁড়িয়ে দেব।”
* “তোমরা রাশিয়ার সস্তা তেল কিনতে যে অর্থ ব্যবহার করছ, তা আসলে রক্তের টাকা।”
* “এই দেশগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা—হয় মার্কিন অর্থনীতির সুবিধা নেওয়া, নয়তো পুতিনকে সাহায্য করা।”
এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বহু বিষয়ে সহমত হলেও, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র রক্ষায় মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের যে আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রাহাম রাখতেন, তার সঙ্গে ট্রাম্পের পুরোপুরি মিল ছিল না। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের বিদেশনীতি নির্ধারণে পর্দার আড়ালে অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিলেন লিন্ডসে গ্রাহাম।
ইউক্রেন থেকে ফিরেও রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিতে সোচ্চার থাকা এই নেতার আকস্মিক প্রস্থান মার্কিন রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করল। তাঁর এই রহস্যঘেরা ও নাটকীয় বিদায় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।

