Tuesday, May 21, 2024
সম্পাদকীয়

বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা-মার নিরাপদ আবাস

বৃদ্ধ বাবা এবং তার তরুণ সন্তান এক সকালে পার্কে হাটছিলেন। হঠাৎ একটা পাখি দেখে বৃদ্ধ বাবা তার সন্তানের কাছে জানতে চাইলেন, বাবা ওটা কি পাখি ? সন্তান বলল টিয়া। বাবা আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা ওটা কি পাখি ? ছেলে কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল, বললাম না ওটা টিয়া। বাবা আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, ওটা কি পাখি ? এবার সন্তান মেজাজ চড়া করে বলল শুনতে পাওনি ওটা টিয়া পাখি। বাবা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা ওটা কি পাখি ? সন্তান এবার আর পাখির নাম বাবাকে বলে নি। বলেছে, তোমার সমস্যা কি ? পাগল হয়ে গেলে নাকি ? একটা কথা এতবার বললাম তারপরও তুমি বারবার জিজ্ঞাসা করছো, কি পাখি ? মেজাজ খারাপ করে কতক্ষন বাবাকে মন্দ বলে ছেলে পার্কের বেঞ্চে বসে পড়ল। বাবা ছেলেকে সেখানে একটু সময় বসতে অনুরোধ করে বাসায় এসে একটি ডায়েরী নিয়ে আবারও ছেলের কাছে ফিরে গিয়ে ডায়েরীটা তাকে পড়তে বলল। ডায়েরীটা পড়ে ছেলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল এবং বাবার কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। পাঠকগণ অনুমান করতে পারছেন, ডায়েরীতে কি লেখা ছিল ? বাবা এই ডায়েরীটা তার ছেলের বয়স যখন ৪ বছর তখন লিখেছিলেন। তখনও বাবা তার কৌতুহলী ছেলেকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে এসেছিলেন। ছেলে একটি টিয়া পাখি দেখে বাবার কাছে ৪২ বার জানতে চেয়েছিল বাবা ওটা কি পাখি। বাবা বিরক্ত হননি বরং প্রতিবার উত্তর দিয়েছিলেন। বাবা তার ডায়েরীতে লিখেছিলেন, আমার সন্তান আজ আমার কাছে একটি পাখি দেখে ৪২ বার তার নাম জানতে চেয়েছিল এবং আমি প্রত্যেক বার তাকে পাখিটির নাম বলেছি এবং আমার কলিজার টুকরা প্রত্যেকবারই আনন্দ পেয়েছে।

আমাদের সমাজে বারবর আবর্তিত হচ্ছে এই ধরনের গল্প। তবে সে সকল গল্পে বাবার কাছে সন্তানের ক্ষমা চাওয়ার দৃশ্য খুব কম বরং জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন বাবা-মাকে সন্তানের কাছ থেকে দূরে সড়িয়ে দেয়া হয়। অনেকেই ওল্ড হোম বা বৃদ্ধদের জন্য আবাসিক ভবনে এসে আশ্রয় নেন। কেউ হয়তো স্বাধীনভাবে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় চলে যান বৃদ্ধাশ্রমে, কেউবা নিতান্ত বাধ্য হয়েই এ ভাগ্যকে বরণ করে নেন। প্রবীণরা আমাদের অনেকের কাছেই স্রেফ ‘বুড়া-বুড়ি’। আমরা ভুলে গিয়েছি সমাজে  প্রচলিত প্রবাদবাক্য, ‘যদি কিছু শিখতে চাও, তিন মাথার কাছে যাও’। আর তা হচ্ছে আমাদের প্রবীণরা, আমাদের শেকড়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা সে শেকড়টি যেন উপড়ে ফেলছি।

বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা-মার নিরাপদ আবাস

বৃদ্ধাশ্রমের যাত্রার ইতিহাস বহু আগের। ঘরছাড়া অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের এই উদ্যোগ ছিল শান রাজবংশের। খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে ইতিহাসে আলাদা জায়গাই দখল করে নিয়েছে এই শান রাজবংশ। পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত সেই বৃদ্ধাশ্রমে ছিল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আরাম-আয়েশের সব রকম ব্যবস্থাই। ছিল খাদ্য ও বিনোদনব্যবস্থা।

তবে এখনকার দিনে বৃদ্ধাশ্রম হয়ে উঠছে দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার। আর্থিকভাবে সচ্ছল সন্তান নৈতিকতার অবক্ষয়ের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পিতা-মাতাকে এক অর্থে ত্যাগ করে ফেলে যাচ্ছে এসব আশ্রমে। এককালের একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে, আর তাতে স্থান হচ্ছে না বৃদ্ধ পিতা-মাতার। যে বাবা-মা একসময় নিজে না খেয়েও সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, তারা আজ কোথায় কেমন আছেন, সেই খবর নেয়ার সময় যার নেই তার নিজের সন্তানও হয়তো একদিন তার সাথে এমন আচরণই করবে।

বৃদ্ধাশ্রম হোক সন্তানের ঘর

বর্তমান সময়ে দেখা যায়, বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন আর ভরণ-পোষণকে কেন্দ্র করে শুরু হচ্ছে দাম্পত্য কলহ আর এর পরিণতিতে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তান নিজের পরিবার নিয়ে আরামেই দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু বৃদ্ধ পিতা-মাতার খরচ দেওয়া দূরে থাক, একবার গিয়ে খবরও নিচ্ছে না, আঁস্তাকুড়ে আবর্জনা ফেলার মতো করে একবার বৃদ্ধাশ্রমে তাদের দিয়ে এসেই দায়িত্ব শেষ করছে। নিজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা-মাকে নিংড়ে নিয়ে শেষ বয়সে তাদের ছুড়ে ফেলার জন্য এমন একটি জায়গাই যেন তাদের দরকার ছিল। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মানুষগুলো দেখে মনে হয় আনন্দেই আছেন, কিন্তু তাদের মনের বেদনাগুলো ঠিকই প্রকাশ পায়। তারা নিজের পরিবারের মানুষের সান্নিধ্য কামনা করেন, ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনিদের কাছে পেতে চান। যতই মান-অভিমান করুক না কেন, নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানকে পিতা-মাতা ভুলতে পারেন না কখনই। সন্তানদের একবার দেখার জন্য ব্যাকুল থাকেন সব সময়। কিন্তু সেই সন্তান একবারও বৃদ্ধ পিতা-মাতার খোঁজ নেয় না।

এখনই সময় এ নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালন সুনিশ্চিত করার, প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করার। সবার মনে রাখা উচিত, তার নিজের সন্তানকে তিনি যেভাবে লালন-পালন করছেন, তার পিতা-মাতাও তাকে সেভাবেই লালন-পালন করে বড় করেছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে নিজের সন্তানের মতোই বাবা-মাকে আরেক সন্তান মনে করে, অবহেলায় বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে না দিয়ে, তাদের সেভাবেই সেবা-যত্ন দিয়ে তাদের বাকি জীবনকে যতটুকু সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা যায়, তা করে যেতে হবে। অবহেলা, অযত্ন আর দায়মুক্তির মন-মানসিকতা নিয়ে কোনো সন্তানই যেন তার মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে না দেন। এই উদ্দেশ্যে যেমন কঠোর আইন করা দরকার, তেমনি দরকার নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার, সামাজিক অনুশাসনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। আপনার কোমলমতি সন্তান ইঞ্জিনিয়ার হবে, ডাক্তার হবে এই স্বপ্নে আপনি হয়তো বিভোর। সন্তান “মানুষ” হবে কিনা, সেটি ভাবার সময় কোথায় ?

‘আর নয় বৃদ্ধাশ্রম। প্রত্যেকের আশ্রয় হোক নিজের পরিবারে, সন্তানেরই ঘরে।

আমাদের মনে রাখা উচিত- আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যান, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনো কোনো বাবা-মার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, তা সুনিশ্চিত করতে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদ, প্রচারমাধ্যম সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে একটা নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী। তাই আমাদের আজকের দিনের শপথ হোক, ‘আর নয় বৃদ্ধাশ্রম। প্রত্যেকের আশ্রয় হোক নিজের পরিবারে, সন্তানেরই ঘরে।’