Monday, April 13, 2026
Latestদেশ

২৫০০-র বেশি বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু পরিবারকে আইনি জমির মালিকানা দিচ্ছে যোগী সরকার

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: উত্তরপ্রদেশে বহু দশক ধরে বসবাসকারী বাংলাদেশি হিন্দু উদ্বাস্তু পরিবারগুলিকে জমি দিল যোগী সরকার। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে প্রায় ২,৫০০-রও বেশি পরিবারকে নিজেদের বসবাস ও চাষের জমির বৈধ অধিকার পেতে চলেছে। প্রশাসনের মতে, এটি শুধু পুনর্বাসন নয় বরং ‘সামাজিক ন্যায়, মানবিকতা এবং জাতীয় দায়িত্ব’-এর বাস্তবায়ন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দেশভাগের পরও শেষ হয়নি উদ্বাস্তু সমস্যা 

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) হিন্দুদের উপর ধারাবাহিক চাপ, ধর্মীয় নির্যাতন, দাঙ্গা এবং সম্পত্তি দখলের মতো ঘটনার জেরে ১৯৬০ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বহু পরিবার ভারতে চলে আসে।

কেন্দ্র ও উত্তরপ্রদেশ সরকার সেই সময় পিলিভিত, লাখিমপুর খেরি, বিজনোর ও রামপুর জেলায় তাদের বসবাস ও চাষের জন্য জমি দেয়। 

কিন্তু আইনি জটিলতা, অসম্পূর্ণ নথিপত্র, প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে তারা কখনও জমির পূর্ণ মালিকানা পাননি। ফলে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও বহু পরিবার ‘সরকারি জমির দখলদার’ হিসেবেই থেকে যায়।

যোগী সরকারের সিদ্ধান্ত: “নৈতিক দায়িত্বের পূরণ”

২০২৫ সালের জুলাই মাসে উচ্চস্তরের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নির্দেশ দেন, ১৯৬০-৭৫-এর মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ১০,০০০ পরিবারের জমির মামলা খতিয়ে দেখা। যাদের বসত ও চাষের জমি দেওয়া হয়েছিল, তাদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা। জমি না থাকলে বিকল্প জমি দেওয়া। পুরনো আইনি কাঠামোর ফাঁক পূরণ করে নতুন ব্যবস্থা তৈরি।

যোগী আদিত্যনাথ স্পষ্ট বলেন, “আইন মানুষের সুবিধার জন্য, কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়।”

ইতিমধ্যেই পিলিভিতে প্রায় ২,১৯৬ পরিবারের মধ্যে ১,৪৬৬ পরিবারের যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্রুত জমির পাট্টা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

লাখিমপুর খেরির চিত্র: ৩৩১ পরিবার, ৪ গ্রাম

লাখিমপুর খেরিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা ৩৩১টি পরিবার বসবাস করছে-

ধৌরাহরা (Sutkuiya): ৯৭ পরিবার

গোলা: ৩৭ পরিবার

মোহাম্মদী (Mohanganj): ৪১ পরিবার

ফয়াজনগর: ১৫৬ পরিবার

মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১,৫০০–১,৮০০

তিন প্রজন্ম ধরে বসবাস-

প্রথম প্রজন্ম: দেশান্তর

দ্বিতীয়: অনিশ্চয়তায় জীবন

তৃতীয়: অধিকার পেল

জমির পরিমাণ: ছোট ও মাঝারি কৃষক

সরকারি তথ্য অনুযায়ী,

গড়ে ১ থেকে ৭ বিঘা জমি

অনেক পরিবার ৩–৫ বিঘা জমিতে চাষ করে

কেউ কেউ ৭ বিঘা পর্যন্ত পেয়েছে

অর্থাৎ তারা ভূমিহীন নয়, কিন্তু আইনি মালিকও নয়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা প্রথমবার নিজেদের জমির বৈধ মালিক হবে।

পিলিভিত: ৬২ বছরের অপেক্ষার অবসান

পিলিভিতে প্রায় ২,১৯৬ উদ্বাস্তু পরিবার ২৫টি গ্রামে বসবাস করছে।

সমস্যা ছিল- জমি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের নামে। মিউটেশন হয়নি।

পুরনো আইন বাতিল হওয়ায় আইনি পথ বন্ধ। এবার সেই দীর্ঘ ৬২ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে।

সামগ্রিক গুরুত্ব

এই সিদ্ধান্তের ফলে, হাজার হাজার পরিবার আইনি নিরাপত্তা পাবে। জমির উপর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বঞ্চনার আংশিক অবসান হবে। 

উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং ইতিহাসের এক অসমাপ্ত অধ্যায়ের সমাধানের চেষ্টা। বাংলাদেশ থেকে আসা এই উদ্বাস্তু পরিবারগুলির জন্য এটি কেবল জমির পাট্টা নয়, এটি তাদের পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের স্বীকৃতি।

উল্লেখ্য, এর আগে ১০ হাজারের বেশি উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দু পরিবারকে জমি দিয়েছে যোগী সরকার। 

বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা

জমি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধাও পাচ্ছেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রীর কৃষক দুর্ঘটনা কল্যাণ প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রীর কিষাণ সম্মান নিধি, উজ্জ্বলা প্রকল্প, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড, প্রধানমন্ত্রীর গৃহায়ন প্রকল্প, বিধবা ও বার্ধক্য পেনশন, সুকন্যা সমৃদ্ধি প্রকল্প এবং মুখ্যমন্ত্রীর গণবিবাহ প্রকল্পের মতো প্রকল্পগুলির সুবিধা পাচ্ছেন। এছাড়াও, এই গ্রামগুলিতে রেশন বিতরণ, টিকাদান, এমএনআরইজিএ, মিড-ডে মিল, সমগ্র শিক্ষা যোজনা, স্বচ্ছ ভারত মিশন এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার মাধ্যমে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করছেন।

তথ্যসূত্র: OP India