বামপন্থী সেন্সরশিপ ও হিন্দু-বিদ্বেষের স্বীকারোক্তি: উইকিপিডিয়ায় নিষিদ্ধ সহ-প্রতিষ্ঠাতা!
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: উইকিপিডিয়া— মুক্ত ও নিরপেক্ষ বিশ্বকোষের দাবিদার এই প্ল্যাটফর্মটি এখন এক চরম আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে। গত ২২শে জুন এক অভূতপূর্ব ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তে উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষ তার অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি স্যাঙ্গারকে (Larry Sanger) প্ল্যাটফর্ম থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ (Community Ban) করেছে। তথ্য সংশোধনের নামে উইকিপিডিয়ার অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা একচেটিয়া বামপন্থী প্রচারণাতন্ত্র ও হিন্দু-বিদ্বেষী মনোভাবের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় খোদ এর স্রষ্টাকেই নির্বাসনে পাঠানো হলো।
বিতর্কের সূত্রপাত: ‘ইনটেলেকচুয়াল ডাইভার্সিটি’ ও গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ল্যারি স্যাঙ্গারের একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। উইকিপিডিয়ায় নিরপেক্ষতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে তিনি ‘উইকিপ্রজেক্ট ইনটেলেকচুয়াল ডাইভার্সিটি’ (WPID) নামক একটি প্রকল্প চালু করতে চেয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল— উইকিপিডিয়ায় যে সমস্ত ভিন্নমতাবলম্বী বা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে জোরপূর্বক বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের আবার ফিরিয়ে আনা এবং একপেশে সোর্সিং বা তথ্যের উৎসের নিয়মাবলি পুনর্বিবেচনা করা।
এরই মধ্যে গত ২০শে জুন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম CNN-News18-এর একটি পডকাস্টে অংশ নেন স্যাঙ্গার। সেখানে তিনি অত্যন্ত বিস্ফোরক কিছু দাবি করেন:
বামপন্থী পক্ষপাতিত্ব: ২০১০ সালের পর থেকে উইকিপিডিয়া সম্পূর্ণভাবে বামপন্থী ও পশ্চিমা এলিট প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়ার (যেমন: বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস) নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
হিন্দু ও ভারত-বিদ্বেষ: স্যাঙ্গার স্পষ্ট জানান, উইকিপিডিয়ায় সনাতন ধর্ম তথা হিন্দুদের বিরুদ্ধে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কুসংস্কার ও কুৎসিত পক্ষপাতিত্ব কাজ করছে। পশ্চিমা বামপন্থী সাংবাদিকরা স্বভাবসুলভভাবেই অন্য এক বিশেষ ধর্মীয় বা মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেন, যা উইকিপিডিয়ার তথ্যের ওপর ভর করে ছড়িয়ে পড়ছে।
ভারতীয়দের প্রতি আহ্বান: এই পক্ষপাতিত্ব দূর করতে তিনি শিক্ষিত ভারতীয় এবং হিন্দুদের উইকিপিডিয়ায় যোগ দিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
উইকিপিডিয়ার প্রভাবশালী এডিটর ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের একাংশ এই সাক্ষাৎকারকে ‘ক্যানভাসিং’ বা ‘ভোট-স্ট্যাকিং’ (নিজেদের পক্ষে দল ভারী করার চেষ্টা) হিসেবে আখ্যা দেয়। তাদের দাবি, স্যাঙ্গার উইকিপিডিয়ার অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তনের জন্য বাইরে থেকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে উস্কে দিচ্ছেন।
একতরফা বিচার ও জিমি ওয়েলসের বিরোধিতা
উইকিপিডিয়ার অভ্যন্তরীণ আলোচনায় স্যাঙ্গারের এই বক্তব্যগুলোকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়। স্যাঙ্গার একে ‘মব ট্রায়াল’ বা ‘গণ-আদালত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যেখানে কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুনির্দিষ্ট সুযোগ ছিল না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, উইকিপিডিয়ার অপর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস (Jimmy Wales) এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। স্যাঙ্গারের সাথে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও ওয়েলস এই আজীবন নিষেধাজ্ঞাকে ‘হাস্যকর’ ও ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভিন্নমতের যুক্তি তোলার জন্য কাউকে নিষিদ্ধ করলে প্ল্যাটফর্মের নিরপেক্ষতা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু উইকিপিডিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দাপটে খোদ জিমি ওয়েলসের এই আপত্তিও ধোপে টেকেনি।
টার্গেটে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘OpIndia’
স্যাঙ্গারকে নিষিদ্ধ করার পেছনে ভারতীয় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম OpIndia-র প্রসঙ্গটি বারবার উঠে আসে। ইতিপূর্বে ২০২৪ সালে ওপইন্ডিয়া একটি ১৮৭ পাতার বিশদ ডসিয়ার (Dossier) প্রকাশ করে দেখিয়েছিল কীভাবে উইকিপিডিয়া অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ভারতের দিল্লি দাঙ্গা, গোধরা ট্রেন হত্যাকাণ্ড এবং ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনির মতো বিষয়গুলোকে নেতিবাচক এবং হিন্দু-বিদ্বেষী ফ্রেমে উপস্থাপন করে।
উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষ অপইন্ডিয়া (OpIndia) এবং স্বরাজ্য (Swarajya)-র মতো ভারতীয় দক্ষিণপন্থী বা রক্ষণশীল পোর্টালগুলোকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ (Blacklisted) করে রেখেছে, অথচ চরম পক্ষপাতদুষ্ট বামপন্থী পোর্টালগুলোকে ‘নির্ভরযোগ্য উৎস’ হিসেবে ব্যবহার করে। স্যাঙ্গার এই একতরফা সোর্স নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করেছিলেন এবং অপইন্ডিয়া-র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। ফলে উইকিপিডিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা স্যাঙ্গারের বিরুদ্ধে এই অবস্থানকেও অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
উইকিপিডিয়া কি তবে নিরপেক্ষ বিশ্বকোষ, নাকি বামপন্থী পাবলিশার?
এই ঘটনার পর উইকিপিডিয়ার তথাকথিত ‘উন্মুক্ত’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ মুখোশটি পুরোপুরি খুলে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উইকিপিডিয়া দাবি করে, এখানে সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ‘কনসেনসাস’ বা ঐক্যমত্য তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে একদল বেনামী ও প্রভাবশালী অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পুরো প্ল্যাটফর্মের রাশ ধরে রেখেছে, যারা উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের ফান্ড বা অনুদান পেয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
ওপইন্ডিয়ার ডসিয়ারে সুপারিশ করা হয়েছিল যে, উইকিপিডিয়াকে ইন্টারনেটের একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম না ভেবে সরাসরি একটি ‘পাবলিশার’ বা প্রকাশক হিসেবে গণ্য করা উচিত এবং ভারতীয় আইনানুযায়ী এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।
মুক্ত তথ্য প্রবাহের ওপর এক বিশাল আঘাত
ল্যারি স্যাঙ্গারের এই বহিষ্কার কেবল একজন ব্যক্তির শাস্তি নয়; এটি আসলে মুক্ত তথ্য প্রবাহের ওপর এক বিশাল আঘাত। যে মানুষটি এই বিশ্বকোষ তৈরি করেছিলেন, আজ তাকেই ছাঁটাই হতে হলো কারণ তিনি এর ভেতরের অন্ধকার সত্যিটা সবার সামনে এনেছিলেন। উইকিপিডিয়ার এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, প্ল্যাটফর্মটি এখন আর জ্ঞানের আধার নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারণ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: ওপি ইন্ডিয়া


