Saturday, June 27, 2026
Latestদেশ

ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি শুধুমাত্র একজন মুসলিম, তিনি সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন না: মাদ্রাজ হাইকোর্ট

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ধর্মান্তরিত মুসলিমদের ওবিসি (OBC) সংরক্ষণ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক রায় দিল মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চ। হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর কোনও ব্যক্তি পূর্বের অনগ্রসর বা তফসিলি জাতির ভিত্তিতে মুসলিম সংরক্ষণ সুবিধা দাবি করতে পারবেন না—এই মর্মে তামিলনাড়ু সরকারের জারি করা নির্দেশিকাকে সম্পূর্ণ ‘অসংবিধানিক ও স্বেচ্ছাচারী’ আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দিয়েছে আদালত।

বিচারপতি জি. আর. স্বামীনাথন এবং বিচারপতি পি. বি. বালাজির ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী আদালতের রায়কে এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তামিলনাড়ু সরকার এই বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল।

মামলার প্রেক্ষাপট

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে থুথুকুডি জেলার পারমাশিবম নামের এক হিন্দু যুবক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন সমীর আহমেদ। এরপর তিনি তামিলনাড়ুর সংরক্ষিত মুসলিম সম্প্রদায়ের তালিকাভুক্ত ‘মুসলিম লেব্বাই’ (Muslim Lebbai) হিসেবে ওবিসি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু স্থানীয় তহসিলদার তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে সমীর আহমেদ মাদ্রাজ হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।

মামলা চলাকালীন, ২০২৪ সালের ৩ মার্চ তামিলনাড়ু সরকার একটি নতুন নির্দেশিকা (Government Order) জারি করে। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি হিন্দু ধর্মের অনগ্রসর (BC), অতি অনগ্রসর (MBC), ডিনোটিফাইড (DNC) বা তফসিলি জাতি (SC) থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হলে, তিনি ‘অনগ্রসর মুসলিম’ হিসেবে সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন। এই সরকারি নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করেই আবেদনকারী আদালতে তার অধিকার দাবি করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও কঠোর মন্তব্য

মামলাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনানির পর ডিভিশন বেঞ্চ তামিলনাড়ু সরকারের এই নির্দেশিকাকে বাতিল ঘোষণা করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে:

জাতিহীন ইসলাম সমাজ: আদালত পূর্ববর্তী আইনি নজির টেনে বলে, “কোনও হিন্দু যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তিনি কেবলই একজন ‘মুসলমান’ হয়ে ওঠেন। মুসলিম সমাজে তার অবস্থান ধর্মান্তরের আগের জাতির ওপর নির্ভর করে না। ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি পূর্বের সমস্ত জাতিগত পরিচয় থেকে মুক্ত হন।”

সংরক্ষণের অপব্যবহার ও অসংবিধানিক জোট: আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, এই নির্দেশিকার মাধ্যমে তফসিলি জাতি (SC)—যারা সামাজিক পিরামিডের একেবারে নিচে অবস্থান করছেন—তাদের অনগ্রসর শ্রেণির (BC) সমকক্ষ করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র ধর্মান্তরিতদের সংরক্ষণের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই ধরণের তড়িঘড়ি জোট তৈরি করা সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ এবং সংবিধান-বিরোধী।

আদালতের রায়কে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা: হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দেয় যে, আইনসভা বা কার্যনির্বাহী ক্ষমতার দ্বারা আদালতের কোনো চূড়ান্ত রায়কে এভাবে লঘু বা বাতিল করা যায় না। সরকার আদালতের আগের রায়কে নিষ্ক্রিয় করতেই এই পথ বেছে নিয়েছিল।

“ইসলামের সাম্যের ভাবধারার পরিপন্থী”

আদালত এই নির্দেশিকাকে শুধু অসংবিধানিকই বলেনি, এটিকে ‘ইসলাম-বিরোধী’ বলেও উল্লেখ করেছে। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ করেন যে, শত শত বছর ধরে ইসলামিক প্রচারকরা দাবি করে আসছেন যে হিন্দু ধর্মের বিপরীতে ইসলামে কোনো জাতিভেদ নেই এবং এটি একটি সম্পূর্ণ সমতাবাদী (Egalitarian) সমাজ।

রায় দিতে গিয়ে আদালত মন্তব্য করে, “ধর্মান্তকরণের জন্য একদিকে সামাজিক সমতার কথা প্রচার করা, আর অন্যদিকে সংরক্ষণের সুবিধা নিতে ইসলামে স্তরবিন্যাস বা জাতপ্রথা রয়েছে দাবি করা—অত্যন্ত কপটতা। ইসলামে নির্দিষ্ট কিছু অংশকে অনগ্রসর এবং বাকিদের অগ্রসর হিসেবে ভাগ করা কোরআনের নির্দেশের পরিপন্থী।”

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আদালত সাফ জানিয়েছে, তামিলনাড়ুতে ওবিসি সংরক্ষণের আওতায় থাকা সাতটি মুসলিম সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এবং তা মূলত জন্মসূত্রে নির্ধারিত হয়, ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে নয়। ফলস্বরূপ, সমীর আহমেদের আবেদন খারিজ করে স্থানীয় তহসিলদারের সিদ্ধান্তকেই বহাল রেখেছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট। আদালতের এই রায় আগামী দিনে ধর্মান্তকরণ এবং সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনি বিতর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: ওপি ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু