‘বিজন সেতু গণহত্যা—কলকাতার বুকে ১৭ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং দীর্ঘ চার দশকের বিচারহীনতার ইতিহাস’
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: সিপিআইএমের কুকীর্তি — পর্ব ৪
বিষয়: ১৯৮২ সালের বিজন সেতু গণহত্যা—কলকাতার বুকে ১৭ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং দীর্ঘ চার দশকের বিচারহীনতার ইতিহাস।
৩০ এপ্রিল, ১৯৮২।
কলকাতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ দিন।
সেদিন সকালে দক্ষিণ কলকাতার বিজন সেতু, বন্ডেল গেট এবং বালিগঞ্জ রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এমন এক বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যা আজও মানবতা, সভ্যতা এবং গণতন্ত্রের সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়েছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে ১৭ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। তাঁদের কয়েকজনের শরীরে পেট্রোল বা কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।
সেই দিনের ঘটনায় মোট ১৭ জন প্রাণ হারান।
ভাবতে পারেন?
একটি সভ্য শহরের রাস্তায়, অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে, ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যদের এভাবে হত্যা করা হয়েছিল!
আর সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার।
কিন্তু কী ঘটেছিল সেদিন?
১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল আনন্দমার্গের কয়েকজন সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী কলকাতার তিলজলায় তাঁদের সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।
সকাল আনুমানিক সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে তাঁদের বহনকারী গাড়িগুলি দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন স্থানে আক্রমণের মুখে পড়ে।
বিজন সেতু, বন্ডেল গেট এবং বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে উত্তেজিত জনতা তাঁদের গাড়ি থেকে টেনে নামায়।
এরপর শুরু হয় নির্মম গণপিটুনি।
সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাকারীরা লোহার রড ও পাথর ব্যবহার করেছিল। কয়েকজন আক্রান্তের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগানো হয়।
শুধু হত্যা নয়, মৃতদেহের ওপরও অগ্নিসংযোগের বিবরণ পাওয়া যায় সেই সময়ের প্রতিবেদনে।
মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে?
মতাদর্শের বিরোধিতা থাকতে পারে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য কাউকে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কে দিয়েছে?
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী ছিল?
আনন্দমার্গ একটি আধ্যাত্মিক ও সমাজসেবামূলক সংগঠন। ১৯৫৫ সালে প্রভাতরঞ্জন সরকার এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
আনন্দমার্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শন, বিশেষ করে PROUT বা Progressive Utilisation Theory, কমিউনিস্ট মতাদর্শের বিকল্প হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল।
ফলে ষাট ও সত্তরের দশক থেকেই আনন্দমার্গের সঙ্গে বামপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্বের তীব্র মতাদর্শগত সংঘাত তৈরি হয়।
বিভিন্ন সময়ে আনন্দমার্গের সদস্যদের সঙ্গে কমিউনিস্ট কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল।
১৯৮২ সালের হত্যাকাণ্ডের সময় এলাকায় ছেলেধরার গুজব ছড়িয়েছিল বলে তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু গুজব কখনও গণহত্যার যুক্তি হতে পারে না।
কোনও অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, আইন অনুযায়ী বিচার হবে। জনতা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করতে পারে না।
সিপিআইএমের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠেছিল?
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আনন্দমার্গের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, এই আক্রমণের পেছনে সিপিআইএমের কর্মী ও সমর্থকদের ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু দলীয় কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং জনতার উত্তেজনা ও ছেলেধরার গুজবের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
কিন্তু এত বড় হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্ন থেকেই যায়—
একটি রাজ্যের রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৭ জন মানুষকে হত্যা করা হলো কীভাবে?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সময়মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না কেন?
হামলাকারীদের পরিচয় ও রাজনৈতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আনা গেল না কেন?
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে এত দশক সময় লাগল কেন?
তদন্তের ইতিহাসও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
১৯৮২ সালের ১২ মে তৎকালীন সরকার বিচারপতি সমরেন্দ্রচন্দ্র দেবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে।
কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সেই কমিশনের কোনও চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা পড়েছিল কি না, তার নির্ভরযোগ্য নথি পরবর্তী সময়ে পাওয়া যায়নি।
২০১৬ সালের একটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণেও এই বিষয়টি উঠে আসে।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১২ সালে আবার তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি অমিতাভ লালার নেতৃত্বে তদন্ত এগোয়।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেই কমিশন রাজ্য সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন হত্যাকাণ্ড ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিছু সিপিআইএম নেতার ভূমিকা পরীক্ষা করার কথাও উঠে আসে।
তবে সেই প্রতিবেদন কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী সাব্যস্ত করে আদালতের রায় দেয়নি।
২০২৬ সালেও কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না আসা এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পূর্ণ না হওয়ার প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে।
৪৪ বছর পরেও বিচার নিয়ে এত প্রশ্ন!
এটা কি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য উদ্বেগজনক নয়?
আনন্দমার্গের সদস্যদের অপরাধ কী ছিল?
তাঁরা একটি পৃথক ধর্মীয় ও সামাজিক দর্শনে বিশ্বাস করতেন?
তাঁদের সংগঠনের মতাদর্শ কমিউনিজমের সঙ্গে মেলেনি?
কোনও রাজনৈতিক আদর্শের সমালোচনা করা বা বিকল্প দর্শন প্রচার করা কি অপরাধ?
ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার অধিকার দিয়েছে।
কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শই মানুষের জীবনের অধিকারের ঊর্ধ্বে নয়।
আনন্দমার্গের বিরুদ্ধে অন্য কোনও অভিযোগ থাকলেও তার বিচার আইন অনুযায়ী হওয়ার কথা। সেই অভিযোগ কখনও নিরস্ত্র ব্যক্তিদের ওপর গণহামলা ও হত্যাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।
বামফ্রন্ট সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রশ্ন
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
হত্যাকাণ্ডের সময় ক্ষমতায় থাকা কোনও রাজনৈতিক দল এবং সেই দলের প্রত্যেক কর্মীকে অপরাধী বলা যায় না। ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণ করতে হয় প্রমাণের ভিত্তিতে।
কিন্তু রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দায়িত্ব অবশ্যই তৎকালীন সরকারের ছিল।
জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ফলে সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকা, পুলিশের প্রতিক্রিয়া এবং তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ যুক্তিসংগত।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু নিহতদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিচার নিশ্চিত করা গোটা সমাজের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের জন্য অপরিহার্য।
আমার কয়েকটি প্রশ্ন—
সেদিন হামলাকারীরা এত বড় অপরাধ করার সাহস পেল কীভাবে?
কারা এই হামলা সংগঠিত করেছিল?
ছেলেধরার গুজবের উৎস কী ছিল?
পুলিশের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল?
প্রথম তদন্ত কমিশনের কাজ কেন যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হলো না?
২০১৯ সালে জমা দেওয়া তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কেন এখনও জনসমক্ষে আলোচনার জন্য উপলব্ধ নয়?
নিহতদের পরিবার এবং আনন্দমার্গের সদস্যরা কবে সম্পূর্ণ সত্য জানতে পারবেন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়া কোনও একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে প্রচারের বিষয় নয়। এটি ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।
সবচেয়ে বড় কথা—
৩০ এপ্রিল ১৯৮২ সালের ঘটনায় যে ১৭টি প্রাণ হারিয়ে গিয়েছিল, তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষ ছিলেন।
তাঁদের স্বপ্ন ছিল, বিশ্বাস ছিল, পরিবার ও সহকর্মী ছিলেন।
তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের মূল্য ছিল।
রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কাউকে দেয় না।
বিজন সেতু গণহত্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যখন গুজব, অসহিষ্ণুতা এবং সংঘবদ্ধ হিংসা আইনের শাসনকে অতিক্রম করে, তখন তার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে।
শেষে একটাই কথা বলব—
বিজন সেতুর ১৭ জন নিহত আনন্দমার্গীর স্মৃতি যেন কখনও হারিয়ে না যায়।
তাঁদের হত্যার সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনা, প্রমাণ অনুযায়ী দোষীদের দায় নির্ধারণ এবং নিহতদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক, বিচারহীনতার কোনও স্থান গণতন্ত্রে থাকতে পারে না।
মানুষের জীবন কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে ছোট নয়।
বিজন সেতুর ইতিহাস ভুলে যাওয়া যায় না।
১৭টি প্রাণের প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসকে দিতেই হবে।
ডাঃ নারায়ণ ব্যানার্জী (মতামত লেখকের নিজস্ব)

