Wednesday, July 1, 2026
Latestদেশ

চরম গাফিলতি, কাঠগড়ায় পুলিশ: মেঘালয় হাইকোর্টে জামিন বহাল ‘হানিমুন মার্ডার’ মামলার মূল অভিযুক্ত সোনম রঘুবংশীর

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: আইনি জটিলতা এবং তদন্তকারী সংস্থার চরম গাফিলতির সুযোগে জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেলেন মেঘালয়ের বহুল আলোচিত ‘হানিমুন মার্ডার’ (Honeymoon Murder) মামলার মূল অভিযুক্ত সোনম রঘুবংশী। গত ২৯ জুন (সোমবার) মেঘালয় হাইকোর্ট শিলং সেশন কোর্টের পূর্ববর্তী জামিনের আদেশকে বহাল রেখে রাজ্য সরকারের আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালের মে মাসে বিয়ের পরপরই চেরাপুঞ্জিতে হানিমুনে গিয়েছিলেন রাজা রঘুবংশী ও সোনম রঘুবংশী। অভিযোগ ওঠে, সোনম তার প্রেমিক রাজ কুশওয়াহা এবং তিন চুক্তিভিত্তিক অপরাধীর (Contract Killers) সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বামীকে নৃশংসভাবে খুন করার ষড়যন্ত্র রচনা করেন। প্রায় ১০ মাস জেল খাটার পর সেশন কোর্টে সোনমের চতুর্থ জামিনের আবেদন মঞ্জুর হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল রাজ্য সরকার।

যে কারণে জামিন পেলেন মূল অভিযুক্ত

মেঘালয় হাইকোর্টের বিচারপতি ডব্লিউ ডিয়েংডোহ্ (Justice W. Diengdoh)-এর বেঞ্চ রাজ্য সরকারের আপিল খারিজ করার পেছনে নিম্ন আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশের আইনি নথি তৈরির ক্ষেত্রে মারাত্মক কিছু ভুলকে দায়ী করেছেন:

ধারার বিভ্রান্তি ও চরম গাফিলতি: সোনমের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১০৩(১) ধারায় খুনের অভিযোগ আনা হলেও, পুলিশের তৈরি করা অ্যারেস্ট মেমো, রিমান্ড ডায়েরি এবং জাস্টিফিকেশন চেকলিস্ট সহ সমস্ত নথিতে ভুলবশত ৪০৩(১) ধারাটি উল্লেখ করা হয়েছিল। আদালত মন্তব্য করে, “এটি কোনো সাধারণ টাইপোগ্রাফিক বা মুদ্রণজনিত ভুল নয়, কারণ একই ভুল বারবার প্রতিটি নথিতে করা হয়েছে।”

সংবিধানের ২২(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন: ভারতীয় সংবিধানের ২২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো আটক ব্যক্তিকে তার গ্রেফতারির সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু পুলিশি নথিতে সোনমকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না। এমনকি একটি নথিতে তাকে সশস্ত্র বাহিনীর ‘পলাতক’ (Deserter) হিসেবেও উল্লেখ করা হয়, যা প্রমাণ করে পুলিশ কোনো বিচারবুদ্ধি না খাটিয়ে স্রেফ পুরোনো রেডিমেড ফরম্যাট বা ‘টেমপ্লেট’ কপিপেস্ট করে নথিপত্র তৈরি করেছে।

বিচারের ধীরগতি: প্রায় ৭৯০ পাতার চার্জশিট জমা পড়লেও গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রসিকিউশনের গাফিলতিতে মামলা অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। মোট ৯০ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে।

আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ: “তদন্তকারী সংস্থা যেভাবে গ্রেফতারের কারণ ও নথিপত্র তৈরি করেছে, তাতে বিন্দুমাত্র বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ দেখা যায়নি। পুলিশি গাফিলতির দায় আদালতের ওপর চাপানো যায় না।”

জনমানসে ক্ষোভ এবং আইনি বাস্তবতা

এই রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এবং নিহতের পরিবার বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “জামিন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সোনম খালাস পেয়ে গেছেন।” বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চলবে। আদালত শুধুমাত্র পুলিশের পদ্ধতিগত ত্রুটি (Procedural Lapse) এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার খাতিরে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

জামিনের শর্তাবলী: আপাতত ৫০,০০০ টাকার বেল বন্ড এবং সমপরিমাণ টাকার জামিনদারের বিনিময়ে সোনম মুক্তি পেয়েছেন। তবে তাকে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে: ১. আদালতের প্রতি শুনানিতে হাজিরা দিতে হবে। ২. কোনো তথ্য-প্রমাণ বা সাক্ষীকে প্রভাবিত করা যাবে না। ৩. আদালতের অনুমতি ছাড়া এক্তিয়ারের বাইরে যাওয়া চলবে না।

এই মামলাটি আবারও প্রমাণ করল যে, অপরাধ যতই গুরুতর হোক না কেন, পুলিশের নথিপত্র তৈরি এবং তদন্তে সামান্যতম গাফিলতিও আস্ত একটা অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে কতটা দুর্বল করে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: ওপি ইন্ডিয়া