Tuesday, June 30, 2026
Latestকলকাতা

মিড-ডে মিলের জন্য কেন ইসকনকে বেছে নেওয়া হলো? জানুন নেপথ্যের কারণ

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: কলকাতার বিদ্যালয়গুলিতে মিড-ডে মিল পরিচালনার দায়িত্ব ইসকনের অন্নামৃত ফাউন্ডেশনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতি ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে মেনু থেকে ‘ডিম বাদ পড়া’ এবং ‘বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে নিরামিষের জোরপূর্বক প্রবেশ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে নেপথ্যের প্রশাসনিক ও বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পূর্ববর্তী সরকারের চরম ব্যর্থতা, স্বাস্থ্যবিধির বিপর্যয় এবং আর্থিক দুর্নীতির হাত থেকে শিশুদের পুষ্টির অধিকার রক্ষা করতেই এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ভেঙে পড়া পুরনো ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়:

কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পূর্ববর্তী প্রশাসনের অধীনে মিড-ডে মিল (পিএম পোষণ) প্রকল্প কার্যকারিতা হারিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রায় ১০ লাখ কম শিক্ষার্থী এই প্রকল্পের আওতায় খাবার পেয়েছে। রাজ্যের ১৫টি জেলায় অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে, নথিভুক্ত শিশুদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরও বেশি শিশু নিয়মিত খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। কোনো কোনো অঞ্চলে এই হার ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসে। সামগ্রিকভাবে, ১ কোটি ১৩ লাখ নথিভুক্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৬৯ শতাংশ শিশু খাবার পাচ্ছিল, যার অর্থ বাকি বিপুল সংখ্যক শিশু প্রতিদিনের এই পুষ্টি সহায়তা থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে গিয়েছিল।

স্বাস্থ্যবিধির চরম অবহেলা ও আর্থিক অসঙ্গতি:

বিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব রান্নাঘরে খাবার তৈরির পুরনো মডেলে প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। মিড-ডে মিলের খাবারে পোকা, টিকটিকি এবং মরা ইঁদুর পাওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসছিল, যা কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল আর্থিক কেলেঙ্কারি। 

কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘সিঙ্গেল নোডাল এজেন্সি’ (SNA) অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার নিয়ম থাকলেও, অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে যে বরাদ্দের টাকা মূল অ্যাকাউন্টের বাইরে রাখা হচ্ছিল, যা স্পষ্টতই অর্থ নয়ছয় ও তহবিল অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, রাঁধুনিদের মাত্র ২,০০০ টাকা মাসিক বেতন দেওয়া হতো। এই চরম পারিশ্রমিক বৈষম্যের কারণে ঘন ঘন ধর্মঘট, সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া এবং সঠিক সময়ে খাবার না পৌঁছানো বা একেবারেই রান্না না হওয়ার মতো ঘটনা নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

কেন ইসকন এবং একটি কেন্দ্রীয় রান্নাঘর (Central Kitchen) মডেল?

এই অচল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা সংস্কারে নতুন প্রশাসন আমূল পরিবর্তন আনে। প্রতিটি শিশুর খাবারের উপাদানের বরাদ্দ ৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয় এবং রাঁধুনিদের বেতন একলাফে ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। একই সাথে, প্রতিটি স্কুলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় আধুনিক রান্নাঘরের (Central Kitchen) মাধ্যমে খাবার সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তৎক্ষণাৎ এত বড় পরিসরে ও নিখুঁত স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার সরবরাহের সক্ষমতা অন্য কোনো সংস্থার ছিল না। রামকৃষ্ণ মিশন বা অন্য কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বেসরকারি সংস্থা (NGO) এই গুরুদায়িত্ব নিতে কোনো প্রস্তাব জমা দেয়নি। দেশজুড়ে প্রতিদিন ১২ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ইসকনের ‘অন্নামৃত ফাউন্ডেশন’-ই একমাত্র সংস্থা হিসেবে এগিয়ে আসে। ফলে সরকারের সামনে বিকল্প ছিল দুটি: হয় আগেকার দূষিত ব্যবস্থা চালু রাখা, না হয় ইসকনের মতো দক্ষ সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া।

মেনু বিতর্ক ও বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের ভ্রান্ত ধারণা: সমালোচকদের একাংশ ডিম না থাকাকে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী বলে দাবি করলেও, সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বাঙালির দৈনন্দিন দুপুরের খাবারের প্রায় ৭৫ শতাংশ অংশই নিরামিষ (যেমন: ডাল, শাক, তিতো, আলুভাজা, তরকারি)। কর্মজীবী মানুষ বা স্কুলপড়ুয়া শিশুদের টিফিনে নষ্ট হয়ে যাওয়া বা গন্ধ হওয়ার ভয়ে সাধারণত বাড়িতেও মাছ বা ডিম দেওয়া হয় না। তাছাড়া, ইসকন ডিমের বিকল্প হিসেবে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে ওমেগা-৩ (Omega-3) এবং ডিএইচএ (DHA) নিশ্চিত করে পুষ্টির মান বজায় রাখছে, যা ইতিমধ্যে দেশের ২ কোটিরও বেশি শিশুর অভিভাবক কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রহণ করেছেন।

মিড-ডে মিলের মূল আদর্শ ও বর্তমান বাস্তবতার মেলবন্ধন:

ঐতিহাসিকভাবে, তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে. কামারাজ যখন এই মিড-ডে মিল ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন, তখন এর মূল উদ্দেশ্য কোনো রাজকীয় ভোজ দেওয়া ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সরল—দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যেন অন্তত এক বেলা পুষ্টিকর ও পরিচ্ছন্ন খাবারের টানে স্কুলে আসে এবং স্কুলছুটের হার কমে। যে সমস্ত পরিবারের পক্ষে সন্তানদের দু’বেলা দুমুঠো অন্ন সংস্থান করা কঠিন, তাদের কাছে খাবারের মেনুর চেয়ে খাবারের পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিগুণ এবং নিয়মিত পাতে পৌঁছানোটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চবিত্ত বা সচ্ছল পরিবারের শিশুরা, যারা স্কুলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল নয়, তারা সহজেই তাদের প্রোটিনের চাহিদা রাতে নিজ বাড়িতে পূরণ করতে পারে।

কলকাতার স্কুলগুলোতে ইসকনকে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিষয় নয়, এটি একটি প্রশাসনিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত। ডিম বা মাছের জন্য যে ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা মূলত মাঠপর্যায়ের মূল সমস্যাকে আড়াল করে। যেখানে লাখ লাখ শিশু দূষিত খাবারের শিকার হচ্ছিল কিংবা একেবারেই খাবার পাচ্ছিল না, সেখানে একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের পাতে প্রতিদিন পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার পৌঁছে দেওয়াটাই প্রশাসনের প্রধান সাফল্য।

তথ্যসূত্র: Swadharma