Tuesday, June 30, 2026
Latestদেশ

৩৬ বছর পর বড় পদক্ষেপ, কাশ্মীরি পণ্ডিত নার্সকে অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ইয়াসিন মালিক-সহ JKLF জঙ্গিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: দীর্ঘ ৩৬ বছর পর অবশেষে কাশ্মীরি পণ্ডিত নার্স সরলা ভাট অপহরণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক মোড় এল। ১৯৯০ সালের এই কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ করে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের স্টেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (SIA) শ্রীনগরের একটি বিশেষ এনআইএ (NIA) আদালতে ৭৩৭ পাতার একটি চার্জশিট দাখিল করেছে। এই চার্জশিটে নিষিদ্ধ সংগঠন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (JKLF)-এর তৎকালীন প্রধান ইয়াসিন মালিককে মূল ষড়যন্ত্রকারী ও অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপটি ‘সন্ত্রাসবাদের শিকারদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক’ এবং জম্মু ও কাশ্মীরে পুরনো সন্ত্রাসী অপরাধের তদন্তের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও তদন্তের ইতিহাস

১৯৯০ সালে ২৭ বছর বয়সী সরলা ভাট শ্রীনগরের শের-ই-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (SKIMS)-এর নিওনাটোলজি বিভাগের নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯০ সালের ১৮ এপ্রিল তাঁকে অপহরণ করা হয়। পরদিন, ১৯ এপ্রিল, শ্রীনগরের মাল্লাবাগ-ওমর কলোনি রোডে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার হয়।

দীর্ঘদিন ফাইলবন্দি থাকার পর, ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ পরিচালকের (DGP) নির্দেশে মামলাটি এসআইএ (SIA)-র হাতে ন্যস্ত করা হয়।

অভিযুক্তদের তালিকা

দাখিল করা চার্জশিটে মোট পাঁচজন জেকএলএফ (JKLF) জঙ্গির নাম রয়েছে:

ইয়াসিন মালিক: মূল অভিযুক্ত, যিনি বর্তমানে অন্য একটি মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে তিহার জেলে রয়েছেন।

খুরশিদ আহমেদ চালকু: বর্তমানে পলাতক এবং ধারণা করা হয় সে পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে (PoJK) পালিয়ে গেছে।

আব্দুল হামিদ শেখ, মোহাম্মদ ইউসুফ সোফি ওরফে ইদ্রিস এবং গুলাম মোহাম্মদ তাপলু: এই তিন অভিযুক্তের ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে।

পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও জাতিগত নিধন

এসআইএ-র চার্জশিটে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরলা ভাটের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়কে উপত্যকা থেকে বিতাড়িত করার এবং আতঙ্ক ছড়ানোর লক্ষ্যে জেকএলএফ-এর একটি সুপরিকল্পিত ও নিয়মতান্ত্রিক প্রচারণার অংশ।

তদন্তে জানা গেছে, ইয়াসিন মালিকের সরাসরি নির্দেশে চার জেকএলএফ জঙ্গি সরলা ভাটকে অপহরণ করে। হত্যার আগে তাঁর ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও অত্যাচার চালানো হয় এবং পরে রাইফেল দিয়ে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়।

মিথ্যা অপবাদ ও প্রমাণের বিবরণ

তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে এবং একে বৈধতা দিতে জেকএলএফ সরলা ভাটকে ‘সুরক্ষা বাহিনীর তথ্যদাতা (Informer)’ হিসেবে চিত্রিত করেছিল। জঙ্গিদের দাবি ছিল, ১৯৯০ সালের ৮ এপ্রিল নারওয়ারায় সুরক্ষা বাহিনীর অভিযানের পেছনে সরলার হাত ছিল—যে অভিযানে বেশ কয়েকজন জঙ্গি ধরা পড়ে এবং ইয়াসিন মালিক নিজে আহত হয়ে পালিয়েছিল। তবে এসআইএ-র তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল এবং পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতেই এই অজুহাত তৈরি করা হয়েছিল।

তদন্তে গৃহীত মূল তথ্য-প্রমাণসমূহ:

প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য: সুরক্ষিত ও স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি।

মেডিকো-লিগ্যাল ও ব্যালেস্টিক রিপোর্ট: শরীরে একাধিক বুলেটের ক্ষত এবং তীব্র শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন।

স্বীকারোক্তিমূলক নোট: ঘটনাস্থল থেকে জেকএলএফ-এর দায় স্বীকার করা একটি নোট উদ্ধার করা হয়। যদিও দিল্লির সিএফএসএল (CFSL) ল্যাব সেই হাতের লেখা নিশ্চিত করতে পারেনি, তবে ঘটনার পর তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করে।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ক্ষয়ক্ষতি

২০০৮ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের একটি সমীক্ষা রিপোর্টে জানানো হয়েছিল যে, ১৯৮৯ সালের পর থেকে উপত্যকায় জঙ্গিদের হাতে ২০৯ জন কাশ্মীরি পণ্ডিত নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে কেবল ১৯৯০ সালেই ১০৯ জনকে হত্যা করা হয়। যদিও কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

সরলা ভাট মামলার এই চার্জশিট উপত্যকায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ওপর হওয়া ঐতিহাসিক অন্যায়ের বিচারের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।