Saturday, May 23, 2026
Latestরাজ্য​

প্রকাশ্যে পশুজবাই করা যাবে না, সমস্ত বিধিনিষেধ বহাল থাকছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞপ্তি বহাল রাখলো হাইকোর্ট

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: বকরি ইদের আগে গরু ও মহিষ জবাই সংক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা বিধিনিষেধ বহাল রাখল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, গত ১৩ মে রাজ্য সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তি কার্যকর থাকবে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, প্রকাশ্যে পশুজবাই নিষিদ্ধ— এই শর্ত বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত করতে হবে।

আদালত আরও জানায়, পূর্ববর্তী রায়ে গরু কুরবানি নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, সেটিও বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ধারা ১২ অনুযায়ী, কোনও ছাড়ের আবেদন এলে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাজ্যকে। আদালত রাজ্য সরকারকে শংসাপত্র প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোও খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। যদিও আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলা চলবে, আপাতত বিজ্ঞপ্তির উপর কোনও স্থগিতাদেশ দেয়নি হাইকোর্ট।

শুনানিতে আদালত স্মরণ করিয়ে দেয় স্টেট অফ বিহার বনাম মহম্মদ হানিফ কুরেশি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথা। সেখানে বলা হয়েছিল, গরু জবাই ইদ-উজ-জোহার অবিচ্ছেদ্য ধর্মীয় অংশ নয় এবং ইসলামে তা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় প্রয়োজনও নয়।

রাজ্যের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর, পুরুষ ও স্ত্রী মহিষ, মহিষের বাছুর এবং নপুংসক মহিষ— কোনও পশুকেই জবাই করা যাবে না, যদি না সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিকে জবাইয়ের উপযুক্ত বলে শংসাপত্র দেওয়া হয়। পাশাপাশি, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্য স্থানে পশুজবাইও নিষিদ্ধ থাকবে।

রাজ্যের তরফে আদালতে জানানো হয়, ১৪ বছরের বেশি বয়সী অথবা স্থায়ী ভাবে অক্ষম পশুকেই জবাইয়ের জন্য ‘উপযুক্ত’ বলে বিবেচনা করা হবে।

এই নির্দেশিকার বিরোধিতা করে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মামলাকারী রামকৃষ্ণ পাল আদালতে দাবি করেন, গরু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হোক। তাঁর বক্তব্য, বকরি ইদের নামে নিরীহ পশুহত্যা করা হচ্ছে এবং সমস্ত ধরনের পশুজবাইয়ের উপরই নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত।

অন্য দিকে মামলাকারী মহম্মদ জাফর ইয়াসনির দাবি, সরকার যেন স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করে জানায় কোথায় বৈধ কোরবানি করা যাবে এবং কোন কোন অনুমোদিত জবাইখানা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘ফিটনেস শংসাপত্র’ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামোই রাজ্যে নেই। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তির মুখে পড়ছেন। তিনি আরও বলেন, বহু অশিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। অথচ পশুচিকিৎসক কোথায় পাওয়া যাবে বা কীভাবে শংসাপত্র নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।

মামলাকারী মহম্মদ শাকিল ওয়ারসির আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় আদালতে রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি বাতিলের আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য, ১৯৫০ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। যারা ইতিমধ্যেই পশু কিনে ফেলেছেন, তাঁদের জন্য আইনে শিথিলতা আনার দাবিও তোলা হয়।

শুনানিতে জমিয়ত ই-উলেমা-র আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য দাবি করেন, ১৯৫০ সালের আইনটি মূলত কৃষিকাজে ব্যবহৃত পশু সংরক্ষণের জন্য আনা হয়েছিল। বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কৃষিকাজ আর গরু বা মহিষের উপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে গবাদি পশুর সংখ্যা ও দুধ উৎপাদন— দু’টিই বেড়েছে। তাই পুরনো আইনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

তিনি আরও দাবি করেন, আইনটি মূলত ১৯৫২ সালে যেসব এলাকায় পুরসভা ছিল, সেখানেই কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে কলকাতা ও কালিম্পঙের বাইরে এই আইন কার্যকর করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি, কোনও জৈবিক পরীক্ষা ছাড়া পশুর বয়স নির্ধারণ কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত জানিয়ে দেয়, যদি আইন কার্যকর না থাকত, তা হলে প্রতি বছর এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হত না এবং এত মামলা দায়েরেরও প্রয়োজন পড়ত না। ফলে আপাতত রাজ্যের বিজ্ঞপ্তিই বহাল থাকছে।

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেই আইনের ভিত্তিতেই প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া গবাদি পশু জবাইয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আর বকরি ইদের আগে এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই রাজ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।