মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় ডেমোক্র্যাটদের, সিনেট ও হাউসের নিয়ন্ত্রণ দখল
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড়সড় সাফল্য পেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে তারা। এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক এলাকাতেও ভালো ফল করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাড়তে পারে। আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কাজের উপর নজরদারির ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা এবার আরও বেশি ক্ষমতা পাবে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, নিজের প্রশাসনের কর্মসূচি রক্ষা করতে তিনি প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
ভোটগ্রহণের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতাকে ‘চূড়ান্ত ক্ষমতা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটদের পাস করা কোনও আইন তাঁর পছন্দ না হলে তিনি সেটি আটকে দিতে পারেন। এমনকি ‘মিস্টার ভেটো’ (Mr Veto) ডাকনামটিও স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে তিনি ভেটো প্রয়োগ করবেন।
সম্প্রতি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম Truth Social-এ ‘VETO’ শব্দটি পোস্ট করে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প। এর ফলে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের সংঘাত কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভেটো ক্ষমতা নিয়ে কী বলেছেন ট্রাম্প?
ট্রাম্প বলেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে। সেটি হল ভেটো।”
ট্রাম্পের বক্তব্য, ডেমোক্র্যাটরা কোনও আইন প্রস্তাব করলে এবং সেটি তাঁর পছন্দ না হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। যতক্ষণ না আইনপ্রণেতারা তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসছেন, ততক্ষণ তিনি একের পর এক বিলে ভেটো দিতে পারেন।
তিনি বলেন, “তা না হলে আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব। আর তারা নিশ্চয়ই সেটা চাইবে না।”
ট্রাম্প ভেটো ক্ষমতাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অন্যতম শক্তিশালী সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, “আগেও বহুবার এমন হয়েছে। ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষমতা। তারা এমন সব প্রস্তাব পাঠাবে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আর আমি সেগুলিতে ভেটো দেব।”
ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের ‘Trump v. Slaughter’ মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করেন। ওই রায়ে ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সদস্য রেবেকা স্লটারকে অপসারণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি, এই রায়ের ফলে ফেডারেল সংস্থা, বোর্ড এবং কমিশনের উপর প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “স্লটার মামলার রায় প্রেসিডেন্টকে এমন বিপুল ক্ষমতা দিয়েছে, যা আগে কখনও ছিল না।”
তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে ভেটো ক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন তিনি। তবে মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ভেটোকে অতিক্রম করার ক্ষমতাও কংগ্রেসের হাতে রয়েছে।
মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা কী?
মার্কিন সংবিধানের Article I, Section 7 অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট—উভয় কক্ষে কোনও বিল পাস হওয়ার পর সেটি আইনে পরিণত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট চাইলে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
কোনও বিল হোয়াইট হাউসে পৌঁছনোর পর প্রেসিডেন্টের সামনে মূলত দুটি বিকল্প থাকে।
1. বিলে স্বাক্ষর করে সেটিকে আইনে পরিণত করা।
2. আপত্তি জানিয়ে বিলটি কংগ্রেসে ফেরত পাঠানো।
প্রেসিডেন্ট যদি ১০ দিনের মধ্যে (রবিবার বাদ দিয়ে) বিলে স্বাক্ষর না করেন বা সেটি ফেরত না পাঠান, তাহলে সাধারণত বিলটি আইনে পরিণত হয়। তবে এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেসের অধিবেশন শেষ হয়ে গেলে এবং প্রেসিডেন্টের পক্ষে বিলটি ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলে সেটি আর আইনে পরিণত হয় না। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘পকেট ভেটো’ (Pocket Veto)।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রেসিডেন্ট পুরো বিলটিতেই ভেটো দিতে পারেন। কংগ্রেসে পাস হওয়ার পর কোনও বিলের নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারা বাদ দেওয়া বা নিজের ইচ্ছামতো সংশোধন করার ক্ষমতা তাঁর নেই।
কংগ্রেস কি ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করতে পারবে?
হ্যাঁ। মার্কিন কংগ্রেস চাইলে প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করে কোনও বিলকে আইনে পরিণত করতে পারে। তবে তার জন্য প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।
৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে ভেটো অতিক্রম করতে অন্তত ২৯০টি ভোট এবং ১০০ সদস্যের সিনেটে অন্তত ৬৭টি ভোট প্রয়োজন।
অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের হাতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে ভেটো অতিক্রম করার জন্য তাঁদের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদেরও সমর্থন আদায় করতে হবে।
মার্কিন কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রেসিডেন্টদের দেওয়া ভেটোর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রেই কংগ্রেস তা অতিক্রম করতে পেরেছে।
ডেমোক্র্যাটদের উপর চাপ তৈরি করতে কীভাবে ভেটো ব্যবহার করতে পারেন ট্রাম্প?
ভেটো ক্ষমতা শুধুমাত্র কোনও বিল প্রত্যাখ্যান করার হাতিয়ার নয়। কোনও বিল হোয়াইট হাউসে পৌঁছনোর আগেই ভেটো দেওয়ার হুমকি দিয়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে সুবিধা নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট।
ডেমোক্র্যাটরা যদি এমন কোনও আইন পাস করেন, যার বিরোধিতা করছেন ট্রাম্প, তাহলে তিনি সেটিতে ভেটো দেওয়ার হুমকি দিতে পারেন। এর ফলে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বিলের নির্দিষ্ট কিছু ধারা পরিবর্তন করতে অথবা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হতে পারেন।
ট্রাম্প বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে দেখা গিয়েছে, কয়েক মাস ভেটো দেওয়ার পর একসময় তারা এসে বলে, আমাদের একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।”
অর্থাৎ, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁদের উপর চাপ তৈরি করতে চান ট্রাম্প। তবে শেষ পর্যন্ত কোনও ভেটো কার্যকর থাকবে, নাকি কংগ্রেস দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তা অতিক্রম করবে, সেটাই হবে মার্কিন রাজনীতির পরবর্তী বড় লড়াই।

