গ্যাংস্টারের ১৫,২৩৩ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, সেই টাকায় যোগী রাজ্যে গরিবদের জন্য তৈরি বাড়ি-ফ্ল্যাট
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ২০১৭ সালের মার্চ মাসে প্রথমবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও উচ্ছেদ অভিযান ক্রমশ জোরদার করেছে যোগী আদিত্যনাথের সরকার। রাজ্য সরকারের দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গ্যাংস্টার আইনের অধীনে মোট ১৫,২৩৩ কোটি টাকার সম্পত্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সংগঠিত অপরাধ দমনে যোগী সরকারের কৌশল এখন একটি নির্দিষ্ট পথে এগোচ্ছে—গ্যাংস্টারদের সম্পত্তি চিহ্নিত করা, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে ফেলা এবং উদ্ধার হওয়া জমির একটি অংশে দরিদ্রদের জন্য আবাসন তৈরি করা। সরকারের এই উদ্যোগের মূল বক্তব্য, “গ্যাংস্টারের বাড়ি হবে গরিব পরিবারের আবাস।” ইতিমধ্যেই কয়েকটি প্রকল্পে ফ্ল্যাট তৈরি করে উপভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
কত টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে?
২০১৭ সালের মার্চে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে উত্তরপ্রদেশে গ্যাংস্টার আইনের অধীনে সম্পত্তির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের ক্রমবর্ধমান হিসাব সামনে এসেছে।
* ২০২১ সালের আগস্ট: ১,৮০০ কোটি টাকা
* ২০২৩ সালের মার্চ: ৯,০২২.৩৩ কোটি টাকা
* ২০২৩ সালের আগস্ট: ১১,৮৪১ কোটি টাকা
* ২০২৪ সালের শেষ: ১৪,২৪৬ কোটি টাকা
* ২০২৬ সালের অক্টোবর: ১৫,২৩৩ কোটি টাকা
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বছরের পর বছর ধরে অপরাধীদের সম্পত্তির বিরুদ্ধে অভিযান বিস্তৃত হয়েছে।
তবে এই হিসাবের মধ্যে তিন ধরনের পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—সম্পত্তি সংযুক্তিকরণ বা অ্যাটাচমেন্ট, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে ফেলা এবং আদালতের প্রক্রিয়া শেষে সম্পত্তি চূড়ান্তভাবে বাজেয়াপ্ত করা।
সম্পত্তি অ্যাটাচমেন্টের অর্থ, বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন সেই সম্পত্তির ওপর সরকারের আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে, ডিমোলিশন বা উচ্ছেদের মাধ্যমে বেআইনি নির্মাণ ভেঙে ফেলা হয়। আদালতের প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তকরণের ক্ষেত্রেই সম্পত্তির মালিকানা স্থায়ীভাবে সরকারের হাতে যেতে পারে।
অতএব, ১৫,২৩৩ কোটি টাকার পরিসংখ্যানটি সম্পত্তির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের সামগ্রিক পরিমাণ তুলে ধরে।
উদ্ধার হওয়া জমিতে কতগুলি ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে?
চিহ্নিত উদ্ধার হওয়া জমিতে এখনও পর্যন্ত মোট ১৪৮টি ফ্ল্যাট তৈরি করে দরিদ্র পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
১. প্রয়াগরাজের লুকারগঞ্জে ৭৬টি ফ্ল্যাট
প্রয়াগরাজের লুকারগঞ্জে প্রয়াগরাজ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (PDA) প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-আরবান (PMAY-Urban)-এর অধীনে ৭৬টি ফ্ল্যাট তৈরি করেছে। এই প্রকল্পের জমি প্রয়াত গ্যাংস্টার তথা রাজনীতিক আতিক আহমেদের নেটওয়ার্কের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
২০২৩ সালের ৩০ জুন উপভোক্তাদের হাতে ফ্ল্যাটের চাবি তুলে দেওয়া হয়। প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ৬.৬ কোটি টাকা।
২. লখনউয়ের দলিবাগে ৭২টি ফ্ল্যাট
লখনউয়ের দলিবাগে লখনউ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (LDA) প্রায় ২,৩২২ বর্গমিটার জমিতে ৭২টি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির (EWS) ফ্ল্যাট তৈরি করেছে। জমিটি মুখতার আনসারি ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর উপভোক্তাদের হাতে বরাদ্দপত্র তুলে দেওয়া হয়। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৩৬.৬৫ বর্গমিটার এবং দাম ১০.৭০ লক্ষ টাকা।
কাসারি-মাসারিতে আরও ১,২০০টি বাড়ির পরিকল্পনা
উত্তরপ্রদেশ সরকারের আবাসন প্রকল্পের পরবর্তী বড় পদক্ষেপ প্রয়াগরাজের কাসারি-মাসারিতে।
২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সেখানে পদ্মলোক আবাস যোজনার অধীনে ১,২০০টি বাড়ি তৈরির প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৬০২টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫৯৮টি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রকল্পের জমিও আতিক আহমেদের নেটওয়ার্কের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে গ্যাংস্টারদের সঙ্গে সম্পর্কিত জমিতে নির্মিত বাড়ির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১,৩৪৮টি।
এদিকে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে গোরক্ষপুরের পাম প্যারাডাইস আবাসন প্রকল্পে ১৬০টি EWS ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে সেটি রাজ্যের বৃহত্তর সাশ্রয়ী আবাসন কর্মসূচির অংশ, গ্যাংস্টারদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া জমিতে নির্মিত প্রকল্পগুলির অন্তর্ভুক্ত নয়।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের তুলনায় বাড়ির সংখ্যা কম কেন?
গ্যাংস্টারদের সম্পত্তি উদ্ধার করে সেখানে আবাসন তৈরির প্রক্রিয়া এখনও বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। সম্পত্তি সংযুক্তিকরণ, চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তকরণ, ভাঙার নির্দেশ, আদালতের নির্দেশে সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং নির্মিত বাড়ির দখল হস্তান্তরের পৃথক হিসাব-সহ রাজ্যজুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও জনসমক্ষে তৈরি হচ্ছে।
এর পিছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, কোনও সম্পত্তি অ্যাটাচ করা হলেও মামলা চলার কারণে বছরের পর বছর সেটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, উদ্ধার হওয়া জমি শুধু আবাসন তৈরির জন্য নয়, রাস্তা, পার্ক এবং পুলিশি পরিকাঠামো তৈরির কাজেও ব্যবহার করা হয়। তৃতীয়ত, সম্পত্তি চূড়ান্তভাবে সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
কিছু ক্ষেত্রে জমির পূর্ববর্তী আইনি ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লখনউয়ের দলিবাগের জমিতে শরণার্থী বা দেশত্যাগী ব্যক্তিদের সম্পত্তি-সংক্রান্ত আইনের আওতায় থাকা জমিতে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিল। এটি একটি পৃথক কেন্দ্রীয় আইনি কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও LDA সেখানে জমি উদ্ধার ও নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
কী বার্তা দিতে চাইছে যোগী সরকার?
মিরাটের কৃষ্ণপুরীর মতো এলাকায় যেখানে গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে অভিযানে বুলডোজার ব্যবহারের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে, সেখানে সরকারের এই মডেল এখন বাস্তব রূপ পাচ্ছে। অপরাধীদের সম্পত্তি চিহ্নিত করা, জমি উদ্ধার করা এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু জমিতে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলির জন্য ফ্ল্যাট তৈরি করে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তবে সম্পত্তির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের মোট আর্থিক পরিমাণ এবং বাস্তবে তৈরি করে হস্তান্তর করা বাড়ির সংখ্যা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কারণ, সব উদ্ধার হওয়া জমিতে আবাসন তৈরি করা হয় না এবং সব সম্পত্তির আইনি প্রক্রিয়াও একই পর্যায়ে থাকে না।
এখন নজর প্রয়াগরাজের কাসারি-মাসারি প্রকল্পের দিকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে ১,২০০টি বাড়ি তৈরি হলে গ্যাংস্টারদের সঙ্গে সম্পর্কিত জমিতে আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই উদ্যোগ আরও বড় আকার পাবে।

