Friday, June 26, 2026
Latestআন্তর্জাতিক

দেশজুড়ে লাউডস্পিকারে আজান নিষিদ্ধের পরিকল্পনা করছে ডেনমার্ক

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ডেনমার্কে ‘ইসলামীকরণ’ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে আজান দেশব্যাপী নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে। দেশটির কট্টরপন্থী অভিবাসন মন্ত্রী মর্টেন বোডসকভ (Morten Bodskov) এই পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ডেনমার্কের কিছু কিছু এলাকা এখন দেখতে এবং অনুভব করতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের মতো মনে হয়।

ডেনমার্কের সংবাদ সংস্থা ‘রিসাও’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বোডসকভ বলেন, ডেনমার্কে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া এই ‘ইসলামীকরণ’ জনপরিসরে অনেক বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছে। সামাজিক গণতান্ত্রিক (Social Democrats) দলের এই বামপন্থী নেতা বলেন, “ডেনমার্কের ছাদ ফুঁড়ে আজানের শব্দ ভেসে আসা উচিত নয়। ডেনমার্কের রাস্তায় হাঁটার সময় আপনার মনে এই নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকা উচিত নয় যে, আপনি ইসলামাবাদের কোনো শহরতলিতে এসে পড়েছেন কি না।”

ডেনমার্কে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫%, যা দেশটির বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের (Mette Frederiksen) অধীনে ডেনমার্ক যখন ইউরোপের অন্যতম কঠোর অভিবাসন নীতি অনুসরণ করছে, ঠিক তখনই এই মন্তব্যগুলো সামনে এলো।

ইতোমধ্যেই চলতি বছরের শুরুর দিকে ডেনমার্কে জনসমক্ষে সম্পূর্ণ মুখমন্ডল আবৃতকারী ইসলামিক পর্দা (নিকাব/বোরকা) নিষিদ্ধ করে একটি আইন পাস করা হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও নামাজের ঘর বা ‘প্রেয়ার রুম’ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুরনো বিতর্ক ও বর্তমান পরিস্থিতি

দেশব্যাপী আজান নিষিদ্ধ করার এই প্রস্তাব ডেনমার্কে নতুন নয়। এর আগে ২০২০ এবং ২০২৫ সালেও জনসমক্ষে আজান নিষিদ্ধ করার আইনি চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে সেই প্রস্তাবগুলো কখনো সংসদ (পার্লামেন্ট) পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।

অবশ্য ডেনমার্কের কিছু অংশে ইতিমধ্যেই জনসমক্ষে আজান দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজধানী কোপেনহেগেনের কঠোর শব্দদূষণ নীতিমালার কারণে মসজিদগুলো লাউডস্পিকারে আজান প্রচার করতে পারে না। এমনকি কোপেনহেগেনের গ্র্যান্ড মসজিদেও বাইরে কোনো আজান দেওয়া হয় না।

আইনি চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

দেশব্যাপী কোনো ধর্মীয় রীতির ওপর সরাসরি সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তা বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ডেনমার্কের সংবিধান নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ধর্ম ও উপাসনা করার অধিকার রক্ষা করে, তাই এমন পদক্ষেপ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের উদ্বেগ তৈরি করবে। অভিবাসন মন্ত্রী বোডসকভ জানিয়েছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা বজায় রেখে দেশব্যাপী আজান নিষিদ্ধ করা আইনত সম্ভব কি না, সরকার প্রথমে তা খতিয়ে দেখবে।

সমালোচকদের মতে, এই প্রস্তাবটি মূলত একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরো ইউরোপজুড়েই অভিবাসী-বিরোধী মনোভাব চরম আকার ধারণ করেছে, যার ফলে আজান এবং হিজাবের মতো ইসলামিক বিষয়গুলো ক্রমাগত কঠোর নজরদারির মধ্যে পড়ছে। প্রকৃতপক্ষে, গত কয়েক বছর ধরে ডেনমার্কে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি একটি চরম মেরুকরণ সৃষ্টিকারী বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা দেশটির অভিবাসন নীতি ও রাজনৈতিক আলোচনার সাথে জড়িয়ে গেছে।

এর আগে ২০২৩ সালে ডেনমার্কে ইসলামবিদ্বেষী কিছু কর্মী পবিত্র কুরআন পুড়িয়ে ফেলার পর তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক চাপ তৈরি হয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে ডেনমার্ক সরকার ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো নিষিদ্ধ করে একটি আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল।

গত মার্চ মাসের আগাম নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন বর্তমানে তার তৃতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছেন। এই নতুন মেয়াদে তার সরকার আজান নিষিদ্ধ করার এই বিতর্কিত পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে