মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব হিন্দু অর্থনৈতিক ফোরাম ২০২৫
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: মুম্বাইয়ের গ্র্যান্ড হায়াতে ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হল ওয়ার্ল্ড হিন্দু ইকনমিক ফোরাম (WHEF) ২০২৫। শুধু একটি বাণিজ্য সম্মেলন নয়, এই ফোরাম ভারতীয় অর্থনৈতিক ভাবনায় এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করল—যেখানে নীতিনির্ধারণ, শিল্প, উদ্যোগ ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রে রাখা হল সভ্যতাগত মূল্যবোধ, ধর্ম ও জাতীয় স্বার্থ।
দুই দিনের এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক, শিল্পপতি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, MSME উদ্যোক্তা, স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারত ও বিদেশের চিন্তাবিদরা। আলোচনার কেন্দ্রে বারবার উঠে আসে একটাই বার্তা—ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান শুধু পুঁজি ও প্রযুক্তিনির্ভর হলে চলবে না, প্রয়োজন সংগঠিত ও মূল্যবোধভিত্তিক সম্পদ সৃষ্টির মডেল।
আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথে ভারতের ভূমিকা
ফোরামের উদ্বোধনে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস আস্থা ও সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি নাভি মুম্বাইয়ে প্রস্তাবিত ৫৪ তলা আফ্রিকা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। এই কেন্দ্রের প্রতিটি তলায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক দফতর থাকবে, যা বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার স্থায়ী মঞ্চ তৈরি করবে।
ফডণবীসের বক্তব্য, আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক বিশ্বাসের সম্পর্ক ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে ভারতকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিচ্ছে—যেখানে শোষণ নয়, সহযোগিতাই মূলনীতি।
বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ‘উইন-উইন’ নীতি
কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গয়াল ভারতের পরিবর্তিত বাণিজ্য দর্শনের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারত শুধুমাত্র ‘উইন-উইন’ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতেই আগ্রহী এবং এমন কোনও চুক্তি করবে না যা দেশীয় শিল্পের ক্ষতি করে বা কম মাথাপিছু আয়ের দেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতা তৈরি করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), অস্ট্রেলিয়া ও ইএফটিএ ব্লকের সঙ্গে চুক্তি সহ মোট ছয়টি FTA ইতিমধ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান গয়াল। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ২০৪৭ সালে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর আদর্শে তিনি ভারতের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিক উন্নয়ন মডেলের কথা তুলে ধরেন।
পরিকাঠামো ও লজিস্টিক্সে জোর
কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গডকরি বলেন, আগামী দু’বছরের মধ্যেই ভারতের সড়ক পরিকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকাকেও ছাপিয়ে যাবে। তাঁর মতে, লজিস্টিক্স খরচ কমানোই মূল লক্ষ্য, যাতে ভারতীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। উন্নত পরিকাঠামোই বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি।
মহারাষ্ট্রে AI বিশ্ববিদ্যালয় ও AI সিটি
মহারাষ্ট্রের আইটি ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আশিস শেলার ঘোষণা করেন, ছয় মাসের মধ্যে রাজ্যে ভারতের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি সমন্বিত AI সিটি গড়ে তোলা হবে। ই-গভর্ন্যান্স থেকে আই-গভর্ন্যান্স হয়ে AI-নির্ভর প্রশাসনের দিকে এগোচ্ছে রাজ্য সরকার।
এই উদ্যোগে চার লক্ষ দক্ষ আইটি কর্মসংস্থান এবং ৫০,৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC) বিনিয়োগের ৫০ শতাংশ আকর্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আত্মনির্ভরতা ও উৎপাদন শিল্প
JSW গ্রুপের চেয়ারম্যান সাজ্জন জিন্দাল বলেন, পরিষেবা খাত জিডিপির ৬০ শতাংশের বেশি হলেও উৎপাদন শিল্পের অংশ ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ—যা টেকসই উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বিরল খনিজ অনুসন্ধানে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আত্মনির্ভর ভারত কোনও বিকল্প নয়, এটি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা।”
তিনি জানান, JSW গ্রুপ বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রীবাহী গাড়ি এবং ব্যাটারি উৎপাদনে মহারাষ্ট্রে বিনিয়োগ করছে।
বিনিয়োগ, MSME ও স্টার্ট-আপে গুরুত্ব
শ্রী সিমেন্টসের চেয়ারম্যান হরি মোহন বাঙ্গুর মধ্যপ্রদেশে পরিকাঠামো উন্নয়নে ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের ইচ্ছাপত্র তুলে দেন। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব জানান, রাজ্যে ৬ লক্ষ কোটি টাকার বেশি প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাস্তবায়নের পথে।
ফোরামে MSME, মহিলা উদ্যোক্তা ও প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের ভূমিকার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। স্টার্ট-আপ লঞ্চ প্যাডে ছয়টি নতুন উদ্যোগ উপস্থাপিত হয়, যার মধ্যে চারটি প্রকল্প বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ পায়।
ধর্ম ও অর্থনীতির সমন্বয়
এই ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিজ্ঞানানন্দ—আইআইটি খড়গপুরের প্রাক্তনী—চাণক্যের “ধর্মস্য মূলম অর্থ” সূত্রকে সামনে রেখে বলেন, নৈতিকতা ও সামাজিক স্থিতির ভিত্তি হল অর্থনৈতিক শক্তি। তাঁর বক্তব্য, ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই ব্যক্তিগত শক্তিকে সামষ্টিক সাফল্যে রূপান্তরিত করে।
সম্মেলনের শেষে ঘোষণা করা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্ণাটকের হুবল্লিতে হিন্দু ইকনমিক ফোরামের জাতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি মুম্বইয়ে ১৮–২০ ডিসেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেস।
ফোরামের সারকথা একটাই—ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান তার সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস ছাড়া অসম্ভব। ধর্ম, উদ্যোগ ও বৈশ্বিক সহযোগিতার সমন্বয়েই গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের ভারত।


