Friday, October 30, 2026
Latestআন্তর্জাতিক

পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ১৪.৬ শতাংশ থেকে কমে ২ শতাংশের নিচে: রিপোর্ট

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ১৪.৬ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। দেশটিতে হিন্দুদের পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন, সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ এবং তাঁদের জনসংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বুধবার (২৮ অক্টোবর) একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ব্রিটেনের হিন্দু অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন INSIGHT UK।

ব্রিটিশ হিন্দুদের সর্বদলীয় সংসদীয় গোষ্ঠী (All-Party Parliamentary Group for British Hindus বা APPG)-এর কাছে জমা দেওয়া এই রিপোর্টে ঐতিহাসিক নথিপত্রের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের ভুক্তভোগীদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বৈষম্য, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং জীবন ও মর্যাদার প্রতি হুমকির বিষয়গুলি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিপোর্টের শুরুতেই পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য হ্রাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৪১ সালের ভারতীয় জনগণনা অনুযায়ী, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ১৪.৬ শতাংশ ছিলেন হিন্দু। দেশভাগের পর সেই সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। বর্তমানে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম হিন্দু বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে হিন্দু জনসংখ্যার এই বিপুল হ্রাস পাকিস্তান সরকারের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর পিছনে দীর্ঘদিনের হিংসা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদের ইতিহাস রয়েছে।

১৯৪৭ সালের দাঙ্গা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ধারাবাহিক হিংসার ঘটনাও রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া কিংবা বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার হিন্দু পরিবার তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমি ও কৃষিজমির অধিকার হারিয়েছেন। ‘Enemy Property’ আইনের মাধ্যমে তাঁদের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গোটা সম্প্রদায় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়।

রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানে হিন্দুদের প্রতি বৈষম্য শুধু রাস্তাঘাটে হিংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেও এর প্রতিফলন রয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানের ৪১ ও ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও অমুসলিম ব্যক্তি দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। ২০১৯ সালে এই বিধান পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি সংশোধনী বিল আনা হলেও তা আটকে দেওয়া হয়।

এছাড়া পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিককে পাসপোর্টে নিজের ধর্মের পরিচয় উল্লেখ করতে হয় বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। ইসলামাবাদে বর্তমানে কোনও কার্যকর হিন্দু মন্দির নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। রাজধানীতে হিন্দুদের জন্য প্রথম মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ২০২০ সালে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলির হিংসাত্মক বিক্ষোভের জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত সেই মন্দির নির্মিত হয়নি।

রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার বা তারও বেশি হিন্দু ও খ্রিস্টান মহিলা এবং নাবালিকাকে অপহরণ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে অপহরণকারীদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। আক্রান্তদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের নাবালিকা, যাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি

রিপোর্টে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঁচটি জরুরি দাবি জানিয়েছে INSIGHT UK।

1. ব্রিটেন ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বিষয়টিকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মন্দিরের নিরাপত্তা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে।

2. পাকিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে ব্রিটিশ আর্থিক সাহায্যকে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলির জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

3. ইসলামাবাদে অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য দুটি পদ সংরক্ষিত রাখতে হবে, যাতে হিংসা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলি কোনও তথ্য গোপন না করে সরাসরি রিপোর্ট করা যায়।

4. পাকিস্তানে হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতি ছয় মাস অন্তর ব্রিটিশ সরকারকে একটি সরকারি রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।

5. জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটেনে আশ্রয় পাওয়ার জন্য বিশেষ ও নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।