Wednesday, October 28, 2026
Latestআন্তর্জাতিকদেশ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করতে রাশিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করুক ভারত, নয়াদিল্লিকে বার্তা পোল্যান্ডের

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন ইউক্রেন যুদ্ধে শান্তি ফেরানোর আশা করছে, তখন রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানালেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। তাঁর মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সুদীর্ঘ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এই যুদ্ধে শান্তি ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে নয়াদিল্লি। কিন্তু ভারত কি সত্যিই শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠতে পারবে?

সম্প্রতি ভারত সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে মোদীকে তিনি ‘আশার আলোকবর্তিকা’ বলে উল্লেখ করেন।

দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় উঠে আসে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গও। ইউক্রেন পোল্যান্ডের প্রতিবেশী দেশ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে ওয়ারশ।

যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, “শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া সমস্ত প্রচেষ্টাকে আমরা সমর্থন করব।”

এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করা এবং শস্য ও জ্বালানি পরিবহণকারী জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে ভারত। নয়াদিল্লি সফরে আসার আগেও ডোনাল্ড টাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভারত ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ নিতে পারে। তাঁর কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান তিনি।

যদিও ভারত সফরে যুদ্ধ বন্ধের জন্য কোনও নির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়নি, তবুও ইউরোপের বহু দেশ এখনও আশাবাদী যে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বকে কাজে লাগিয়ে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেই যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সিদ্ধান্তের উপর নয়াদিল্লি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, এমনটা নিশ্চিত নয়।

‘ভারত শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না’

ভারতের প্রাক্তন পোল্যান্ড-রাষ্ট্রদূত অনিল ওয়াধওয়ার মতে, ইউরোপের চাপে ভারত নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে চাইবে না। এখনও পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে ভারত আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে সওয়াল করেছে এবং পশ্চিমী দেশগুলির রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম হওয়ার চাপও এড়িয়ে গিয়েছে।

ভারত মস্কো ও কিয়েভ—দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারলেও, নয়াদিল্লির উদ্যোগে কোনও পক্ষ সাড়া দেবে কি না অথবা সমঝোতায় রাজি হবে কি না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

ওয়াধওয়া বলেন, পোল্যান্ড চাইছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধবিরতি এবং অর্থবহ আলোচনার পথ তৈরি করা হোক। তবে রাশিয়ার সামরিক সিদ্ধান্তের উপর ভারতের প্রভাব যে সীমিত, সেটিও স্বীকার করতে হবে।

তাঁর মতে, ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে নয়াদিল্লির কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা রাখা উচিত নয়।

ওয়াধওয়া বলেন, “উত্তেজনা কমাতে এবং আলোচনার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে ভারত অবদান রাখতে পারে। কিন্তু শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।”

রাশিয়ার সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী ইউরোপ

পোল্যান্ডের এই উদ্যোগের পিছনে ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর করার বৃহত্তর প্রচেষ্টাও রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান বদল, ভারতের গুরুত্ব বাড়ছে ইউরোপের কাছে

ভারতের আরেক প্রাক্তন পোল্যান্ড-রাষ্ট্রদূত অজয় বিসারিয়ার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারতের অবস্থান এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দেশটিকে সম্ভাব্য শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। মস্কো ও কিয়েভ—উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ক্ষমতা ভারতের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

বিসারিয়ার মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে এখন আর ভারত-ইউরোপ বা ভারত-পোল্যান্ড সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছে না ওয়ারশ।

তিনি বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অংশীদারত্ব কতটা গভীর, তা ইউরোপ এবং বিশেষ করে পোল্যান্ড বুঝতে পারে। একইভাবে, মস্কো ও ইউক্রেন যুদ্ধকে ইউরোপের বহু দেশ যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে, ভারতও তা উপলব্ধি করে।”

বিসারিয়ার মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের পিছনে একটি কারণ হল ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে আমেরিকার অবস্থানের পরিবর্তন এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা। এর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে ইউরোপীয় দেশগুলির যুক্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ইউরোপের প্রত্যাশা বাড়ছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধে রাজি করানোর ক্ষমতা ভারতের কতটা রয়েছে, তা এখনও অনিশ্চিত। শান্তি আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে নয়াদিল্লি ভূমিকা নিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সদিচ্ছার উপর। তথ্যসূত্র: DW