রাহুলের মৃত্যুর ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে শ্যুটিং বন্ধের ডাক টলিউডে
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। অভিনেতার অকালমৃত্যু যেন নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা টলিপাড়াকে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মঙ্গলবার থেকে সমস্ত শ্যুটিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টলিউডের একাধিক সংগঠন। কার্যত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির পথে হাঁটছে ইন্ডাস্ট্রি।
রবিবার বিকেলে টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-সহ আরও অনেকে।
বৈঠক শেষে ঘোষণা করা হয়, মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে স্টুডিয়ো চত্বরে উপস্থিত থেকে শিল্পী ও টেকনিশিয়ানরা কর্মবিরতি পালন করবেন। এই সময় কোনও ধরনের শ্যুটিং হবে না। ফেডারেশনের তরফে জানানো হয়েছে, শ্যুটিং সেটে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও বাধ্যতামূলক না করা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকতে পারে।
গত ২৯ মার্চ তালসারিতে একটি ধারাবাহিকের শ্যুটিং করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনাটি প্রথমে ‘দুর্ঘটনা’ বলে মনে করা হলেও, ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করেছে একাধিক প্রশ্ন।
অভিযোগ উঠেছে, শ্যুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি ছিল না । সেটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। জরুরি পরিস্থিতির জন্য কোনও প্রস্তুতিও রাখা হয়নি। এই সমস্ত অভিযোগ ঘিরেই ক্রমশ চড়ছে উত্তেজনা।
রাহুলের মৃত্যুর পর থেকেই টলিপাড়ার একাংশ সরব হয়েছে। শিল্পী ও কলাকুশলীদের একটি বড় অংশ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি, এই মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি গাফিলতির ফল। এবং এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি চাই। শিল্পীদের কথায়, “আজ রাহুল, কাল যে কেউ হতে পারে। যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়।”
এই ঘটনায় বিশেষভাবে কাঠগড়ায় উঠেছে ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ প্রযোজনা সংস্থা। অভিযোগ, সংস্থার তরফে শ্যুটিংয়ের ক্ষেত্রে একাধিক নিয়ম ভঙ্গ করা হয়েছিল।
যদিও এই বিষয়ে সংস্থার তরফে এখনও বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা সামনে আসেনি, তবে শিল্পী মহলে ক্ষোভ তুঙ্গে।
স্বামীর মৃত্যুর বিচার চেয়ে সরাসরি আইনি পথে হেঁটেছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। প্রথমে কলকাতার রিজেন্ট পার্ক থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। এরপর তালসারি থানায়ও এফআইআর দায়ের করেন তিনি, সঙ্গে ছিলেন টলিউড আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যরা।
এই ঘটনায় মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রযোজনা সংস্থার ডিরেক্টর শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়, লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, শুভাশিস মণ্ডল, শান্তনু নন্দী, চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, Tollywood Artist Forum-এর সদস্য ছিলেন রাহুল নিজেও। ঘটনার পর ফোরামের তরফে প্রযোজনা সংস্থাকে চিঠি দিয়ে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে সন্তোষজনক উত্তর না মেলায়, ফোরাম আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফোরামের বৈঠকেই এফআইআর দায়ের এবং পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। এই ঘটনার প্রভাব পড়তে চলেছে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে। শ্যুটিং বন্ধ থাকার ফলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলেও, শিল্পীদের মতে, নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস নয়।
অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনাই ভবিষ্যতে শ্যুটিং সেটে কঠোর সুরক্ষা নীতিমালা চালুর পথ খুলে দিতে পারে। রাহুলের মৃত্যু যেন শুধু একটি ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত এমনটাই বলছেন ইন্ডাস্ট্রির একাংশ।
এখন নজর প্রশাসনের দিকে, তদন্ত কত দ্রুত এগোয়, দোষীদের শাস্তি হয় কি না, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনার পর টলিউডে কতটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা যায়।


