‘হোয়াইট কলার টেরর’ নেটওয়ার্কের পর্দা ফাঁস করে দেশকে বড়সড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের একটি সাধারণ তদন্ত গোটা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি সাধারণ পোস্টারকে কেন্দ্র করে এমন এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের পর্দাফাঁস হয়েছে, যা দুই বছর ধরে গোপনে সক্রিয় ছিল এবং ভারতের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল। এই নেটওয়ার্কের মূল সদস্যরা ছিলেন ডাক্তার, ছাত্র ও ধর্মীয় নেতা—অর্থাৎ তথাকথিত “হোয়াইট কলার টেররিস্ট”।
ঘটনার সূত্রপাত: একটি পোস্টার থেকে শুরু
১৯ অক্টোবর শ্রীনগরের নওগাম এলাকার বুনপোরায় জইশ-ই-মহম্মদের (Jaish-e-Mohammad) হুমকিমূলক পোস্টার দেখা যায়, যাতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। নওগাম থানায় ইউএপিএ, বিস্ফোরক পদার্থ আইন ও অস্ত্র আইনের আওতায় মামলা দায়ের করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে তিনজন ওভারগ্রাউন্ড কর্মী (OGW) শনাক্ত করা হয় — আরিফ নিসার দার ওরফে সাহিল, ইয়াসির-উল-আশরাফ এবং মাকসুদ আহমেদ দার ওরফে শহিদ।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই উঠে আসে শোপিয়ানের মৌলবী ইরফান আহমেদের নাম, যিনি জিএমসি শ্রীনগরের এক প্যারামেডিক্যাল কর্মী ও নওগাম মসজিদের ইমাম। ইরফানই ছিল মৌলবাদী চিন্তাধারা ছড়ানোর মূল ব্যক্তি, যে তিনজন তরুণ চিকিৎসককে উগ্রপন্থার পথে টেনে নেয়।
৫ নভেম্বর: ডাঃ আদিল রাথর গ্রেফতার
ইরফান আহমেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর থেকে ডাঃ আদিল রাথরকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, দেশের বিভিন্ন শহরে একাধিক বিস্ফোরণের পরিকল্পনা ছিল তাদের। এছাড়া সে তার সহযোগী ডাঃ মুজাম্মিল গণাই, ডাঃ শাহিন সাইদ এবং পলাতক ডাঃ উমর নবীর নাম প্রকাশ করে। ইরফানের মোবাইল ফোন ঘেঁটে পুলিশ পাকিস্তানি হ্যান্ডলার উমর বিন খাত্তাবের সঙ্গে যুক্ত এক টেলিগ্রাম চ্যানেলের সন্ধান পায়।
৮ নভেম্বর: ফরিদাবাদে গ্রেফতার ডাঃ মুজাম্মিল
ডাঃ আদিলের বয়ানের ভিত্তিতে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ ও ফরিদাবাদ পুলিশের যৌথ অভিযানে হরিয়ানার আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাঃ মুজাম্মিল গণাইকে গ্রেফতার করা হয়।
শ্রীনগরে আনার পর তার বিরুদ্ধে পাওয়া যায় একাধিক প্রমাণ—তার আলমারিতে রাখা একটি AK-47 রাইফেল, পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিস্ফোরক রাখার নকশা। মুজাম্মিল পুলওয়ামার বাসিন্দা হলেও ফরিদাবাদে শিক্ষকতার আড়ালে জইশ-ই-মহম্মদের হয়ে কাজ করছিল।
৯ নভেম্বর: উদ্ধার ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক
ডাঃ আদিল ও ডাঃ মুজাম্মিলের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ পৌঁছে যায় ফরিদাবাদের ধৌজা গ্রামে, যেখানে মুজাম্মিলের ভাড়া করা ঘরে মজুত ছিল ভয়াবহ বিস্ফোরক।
সেখান থেকে উদ্ধার হয় ২,৯০০ কেজি আইইডি উপাদান, একে-৪৭ রাইফেলসহ বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার।
তদন্তে উঠে আসে ডাঃ উমর নবীর নাম, যে বর্তমানে পলাতক। অপরদিকে উত্তরপ্রদেশ এসটিএফ গ্রেফতার করে ডাঃ শাহিন সাইদ-কে, যে ছিল জেইএম-এর মহিলা শাখার সদস্য ও মুজাম্মিলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার গাড়ি থেকেও একটি একে-৪৭ উদ্ধার করা হয়।
১১ নভেম্বর: দিল্লি বিস্ফোরণের যোগসূত্র
লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের পর এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত একাধিক সন্দেহভাজনের নাম উঠে আসে। পুলওয়ামা থেকে আটক করা হয় ছয়জনকে—তারিক, আমির, উমর রশিদ, গুলাম নবী, ডাঃ সাজ্জাদ মাল্লা এবং শামিমা বেগম।
তাদের ডিএনএ নমুনা লালকেল্লার বিস্ফোরণে ব্যবহৃত আই২০ গাড়ির ধ্বংসাবশেষের ডিএনএর সঙ্গে মেলানো হবে, যাতে ডাঃ উমর গাড়িতে ছিল কিনা তা নিশ্চিত করা যায়।
‘হোয়াইট কলার টেরর’ নেটওয়ার্কের রূপরেখা
তদন্তে জানা গেছে, এই সন্ত্রাসবাদী মডিউল গত দুই বছর ধরে সক্রিয়।
ডাক্তার, ছাত্র ও ধর্মগুরুদের একত্রিত করে তারা তহবিল জোগাড় করত এবং পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখত।
তাদের পরিকল্পনা ছিল দিল্লি ও ফরিদাবাদের আশেপাশে বড় মাপের বিস্ফোরণ ঘটানো। মৌলবী ইরফানই ছিল এই সমগ্র নেটওয়ার্কের স্থানীয় নিয়ন্ত্রক, যে পাকিস্তানের নির্দেশে ডাক্তারদের উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করেছিল।
গ্রেফতার হওয়া ৯ জনের নাম
১. মৌলবী ইরফান আহমেদ
২. ডাঃ আদিল রাথর
৩. ডাঃ মুজাম্মিল গণাই
৪. ডাঃ শাহিন সাইদ
৫. গুলাম নবী
৬. ডাঃ সাজ্জাদ মাল্লা
৭. তারিক আহমেদ
৮. ইয়াসির-উল-আশরাফ
৯. আহমেদ আহঙ্গার ওরফে মুতলাশা।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে


