Bangladesh: ‘বাংলাদেশে গত ৩৫ দিনে ১১ জন হিন্দুকে হত্যা’, ইউনূস সরকারকে কড়া বার্তা ভারতের
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান হিংসার ঘটনায় মহম্মদ ইউনূসের প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিল ভারত। গত ৩৫ দিনে অন্তত ১১ জন হিন্দুকে হত্যার পাশাপাশি বহু মন্দির ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাড়তে থাকা মৌলবাদে লাগাম টানতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে নয়াদিল্লি।
শুক্রবার বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর উগ্রপন্থীদের হামলার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটছে। এই ধরনের সাম্প্রদায়িক হিংসা রুখতে দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধের তকমা দিয়ে এই ঘটনাগুলি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের সাহস জোগায় এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তোলে।”
গত এক মাসে বাংলাদেশে একের পর এক সংখ্যালঘু হিন্দু হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর হিন্দু যুবক দীপু দাসকে নৃশংসভাবে হত্যা করে মৌলবাদীরা। গণপিটুনির পর তাঁকে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর প্রথমদিকে বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
এরপর ২৪ ডিসেম্বর অমৃত মণ্ডল নামে আরও এক হিন্দু যুবককে হত্যা করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় খোকন চন্দ্র দাস নামে ৫০ বছরের এক ব্যক্তির উপর হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
২ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলায় ৪২ বছর বয়সী হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রান্তোষ কর্মকারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রান্তোষ কর্মকার একটি গয়নার দোকানের মালিক ছিলেন, তাকে ব্যবসায়িক আলোচনার জন্য নিকটবর্তী একটি স্কুল খেলার মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্মকারকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পুলিশ তখন বলে যে, উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি।
২ ডিসেম্বর ভোরে ফরিদপুর জেলার সালথা উপজেলায় ৩৫ বছর বয়সী হিন্দু মাছ ব্যবসায়ী উৎপল সরকারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাছ কিনতে পার্শ্ববর্তী একটি বাজারে যাওয়ার সময়, সরকারকে আক্রমণকারীরা পাকড়াও করে। তারা সরকারের ভ্যান চালকের চোখ বেঁধে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে তার রক্তাক্ত দেহ একটি খোলা মাঠে পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার সঠিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয় এবং হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়নি।
৭ ডিসেম্বর সকালে রংপুরে ৭৫ বছর বয়সী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক (মুক্তিযোদ্ধা) যোগেশ চন্দ্র রায় এবং তার স্ত্রী সুবর্ণা রায়কে তাদের বাড়িতে নির্মমভাবে খুন করা হয়। একা বসবাসকারী বৃদ্ধ হিন্দু দম্পতির গলা কাটা অবস্থা ছিল। বারবার ধাক্কাধাক্কির পর প্রতিবেশীরা দম্পতির মৃতদেহ দেখতে পান। পুলিশের অনুমান, ৭ ডিসেম্বর রাত ১টার দিকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। যদিও হত্যার উদ্দেশ্য এবং অপরাধীরা অজানা ছিল।
১২ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলায় ১৮ বছর বয়সী হিন্দু অটোরিকশা চালক শান্ত চন্দ্র দাসকে খুন করা হয়, তার গলা কেটে লাশ একটি ভুট্টার ক্ষেতে ফেলে রাখা হয়। প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করা শান্ত আগের সন্ধ্যায় তার গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন।
রাজবাড়ী জেলার ৩০ বছর বয়সী হিন্দু ব্যক্তি অমৃত মণ্ডলকে ২৪শে ডিসেম্বর জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। স্থানীয় বাসিন্দার কাছ থেকে চাঁদাবাজির চেষ্টার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, অমৃত মণ্ডল একজন কুখ্যাত স্থানীয় অপরাধী এবং “সম্রাট বাহিনীর” নেতা। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল এবং নিয়মিতভাবে গ্রামবাসীদের ভয় দেখাত।
২৯শে ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার একটি পোশাক কারখানায় বাংলাদেশের আধাসামরিক সহায়ক বাহিনী আনসার বাহিনীর একজন হিন্দু সদস্য বজেন্দ্র বিশ্বাসকে তার সহকর্মী নোমান মিয়া গুলি করে হত্যা করে।
৫ জানুয়ারী, ৪৫ বছর বয়সী সংবাদপত্র সম্পাদক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বরফ তৈরির কারখানার মালিক রানা কান্তি বৈরাগীকে অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা গুলি করে হত্যা করে। মোটরসাইকেলে থাকা তিন ব্যক্তি তাকে একটি গলিতে নিয়ে যায় এবং খুব কাছ থেকে গুলি চালায়, ঘটনাস্থলেই তাকে একাধিক গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করে।
৫ জানুয়ারি নরসিংদী জেলার একজন হিন্দু মুদি দোকানের মালিক মণি চক্রবর্তীর উপর তার দোকানে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা হামলা চালায় । তাকে গুরুতর আহত করা হয়, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পথে অথবা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পরপর এই নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে ভারত। নয়াদিল্লির স্পষ্ট বার্তা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। ইউনূস সরকারের কাছে ভারতের দাবি, মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক।


