Monday, February 2, 2026
রাজ্য​

ভুয়ো পোস্টে জনতাকে উসকানি: বারুইপুরে সামিম লস্করের অনলাইন তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ডিজিটাল যুগে একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টই মুহূর্তে জনতাকে রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারে। সেই বাস্তবতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানির সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর এলাকার বাসিন্দা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত মুখ সামিম লস্করের সাম্প্রতিক অনলাইন কার্যকলাপ ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

২৭ জানুয়ারি সামিম লস্কর ফেসবুকে একটি পোস্টে বারুইপুরে একটি ‘শক্তিশালী প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের ঘোষণা করেন। তার দাবি, মুসলিম সম্প্রদায়কে হিন্দু সংগঠনের কথিত আক্রমণ ও ‘সাম্প্রদায়িক মনোভাব’ থেকে রক্ষা করতেই এই উদ্যোগ। পোস্টের ভাষা ছিল তীব্র, আতঙ্কসৃষ্টিকারী এবং জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিতপূর্ণ।

তবে তার এই দাবি ভিত্তিহীন। বরং ২০২৫ সালে বারুইপুর ও সংলগ্ন এলাকায় অন্তত দুটি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুরাই আক্রান্ত হয়েছেন—এর মধ্যে একটি ক্ষেত্রে মন্দির ভাঙচুরের ঘটনাও রয়েছে। 

উদ্বেগের বিষয় শুধু পোস্টের বক্তব্য নয়, তার প্রতিক্রিয়াও। ওই পোস্টে প্রায় ৮০০ লাইক ও প্রায় ৩০০ মন্তব্য পড়ে, যার মধ্যে বহু ব্যবহারকারী প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। অন্তত চারজন মন্তব্যের ঘরে নিজেদের ফোন নম্বরও দেন, যা অনলাইন আলোচনা থেকে অফলাইন সংগঠনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রমাণহীন অভিযোগের ভিত্তিতে এ ধরনের সংগঠনের ডাক জনশৃঙ্খলার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে।

ধারাবাহিক উসকানির অভিযোগ

এই পোস্ট কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেই দাবি পর্যবেক্ষকদের। সামিম লস্করের আগের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলিতেও একাধিক বিতর্কিত ও ভ্রান্ত দাবি লক্ষ্য করা গেছে।

৩০ ডিসেম্বর তিনি আল-কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু উবাইদার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শোকপ্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, আল-কাসাম ব্রিগেড ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা-সহ একাধিক দেশের কাছে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, এমন সংগঠনের মুখপাত্রের প্রতি প্রকাশ্য সহানুভূতি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে উদ্বেগ তৈরি করে।

এছাড়া বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের প্রসঙ্গেও তিনি বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর হামলা, জমি দখল ও নিপীড়নের বহু নথিভুক্ত ঘটনা থাকা সত্ত্বেও, সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারির’ মাধ্যমে বিষয়টি খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে সমালোচনা উঠেছে।

ভুয়ো অপরাধের গল্প ও ইতিহাস বিকৃতি

২৪ জানুয়ারি সামিম লস্কর দাবি করেন, জাকিয়া নামে এক মুসলিম তরুণীকে ‘হিন্দুত্ববাদী’দের দ্বারা গণধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে। পরে একাধিক স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেক সংস্থা এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভুয়ো বলে চিহ্নিত করে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের মিথ্যা ধর্ষণ-হত্যার গল্প অতীতে একাধিক দাঙ্গা ও প্রতিহিংসামূলক হিংসার জন্ম দিয়েছে।

এর আগেও তিনি কেরলের তথাকথিত ‘ব্রেস্ট ট্যাক্স’ নিয়ে বহুবার খণ্ডিত হয়ে যাওয়া একটি গল্প পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। অন্য একটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, হাজি মহম্মদ মহসিন বাংলার প্রথম বিনামূল্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে অযৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত টানেন যে শূদ্র ও দলিতদের সরস্বতী পুজো করা উচিত নয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় বিনামূল্যের শিক্ষার ঐতিহ্য হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে ইসলামি শাসনের বহু আগেই শুরু হয়েছিল।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হিংসার সমর্থন

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ১৬ জানুয়ারির একটি পোস্ট ঘিরে, যেখানে সামিম লস্কর একটি নির্দিষ্ট সংবাদ চ্যানেলের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হিংসার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। মতাদর্শগত বিরোধ থাকলেও সাংবাদিকদের উপর হিংসা সমর্থন করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মত নাগরিক সমাজের একাংশের।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

পর্যবেক্ষকদের মতে, এখানে একটি স্পষ্ট ধারা দেখা যাচ্ছে, প্রথমে প্রমাণহীন হুমকি তৈরি, তারপর পরিচয়ভিত্তিক আতঙ্ক ছড়ানো, ভুয়ো অত্যাচারের গল্প দিয়ে আবেগ উসকানো এবং ইতিহাস বিকৃত করে সমাজে বিভাজন তৈরি।

এই ধরনের অনলাইন প্রভাব শুধু মতপ্রকাশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে জনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শান্তির প্রশ্নে পরিণত হয়। সমালোচকদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব এই ধরনের ধারাবাহিক বিভ্রান্তি ও উসকানির বিরুদ্ধে সচেতন থাকা।

ইতিহাস সাক্ষী, সাম্প্রদায়িক হিংসা হঠাৎ করে শুরু হয় না। তা শুরু হয় গল্প দিয়ে—যেগুলো জোরে বলা হয়, বারবার বলা হয় এবং এমন মানুষের দ্বারা বলা হয়, যারা জানে ভয়কে কীভাবে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়।

References :

https://www.facebook.com/share/p/1FJjQrbb8V/ https://hindupost.in/news/west-bengal-islamist-attacks-shitala-mata-murti-in-baruipur-burned-the-murti-after-vandalism/ https://www.hinduphobiatracker.org/app/case/aa4aea7 https://www.facebook.com/share/r/1Gu5srfurp/ https://www.facebook.com/share/p/1MSUkwy5yZ/ https://www.facebook.com/share/p/1AcBmZDfmh/ https://www.facebook.com/share/p/17bpXuVDhg/

তথ্যসূত্র: হিন্দু ভয়েস