Thursday, September 10, 2026
Latestআন্তর্জাতিক

একজন মা মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি: তসলিমা নাসরিন

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: বাংলাদেশের জেলবন্দি সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা সন্ধ্যা রানি ধর বৃহস্পতিবার ভোরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বুধবার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানানো হয়। ৭১ বছর বয়স বয়সী অসুস্থ মাকে দেখার জন্য চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি (প্যারোল) দেওয়ার আবেদন করেছিল পরিবার। কিন্তু সেই আবেদন মৌখিকভাবে নাকচ করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। এবার মায়ের শেষকৃত্যে যাচ্ছেন এই হিন্দু সন্ন্যাসী। এবার এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকে বিঁধলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

লেখিকা তসলিমা নাসরিন লিখেছেন, “একজন মা মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।

এর চেয়ে সহজ ঘটনা আর কী হতে পারে? এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনাই বা কতগুলো হতে পারে?

সন্ধ্যা রাণী ধর আর নেই। মৃত্যুর আগে তাঁর ইচ্ছা ছিল কারাগারে বন্দি ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে একবার দেখবেন। ছেলে এসে পাশে দাঁড়াবে, হয়তো হাতটি ধরবে, হয়তো মা শেষবারের মতো ছেলের মুখের দিকে তাকাবেন। এতটুকুই।

রাষ্ট্রের কাছে তিনি ক্ষমতা চাননি। সম্পত্তি চাননি। পদ চাননি। বিচার বন্ধ করতে বলেননি। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মা শুধু তাঁর সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তাঁকে সেই সুযোগটিও দিল না।

৯ সেপ্টেম্বর চিন্ময়ের বড় ভাই প্যারোলের আবেদন করলেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিন্ময়ের মুক্তি এবং তাঁর প্রতি মানবিক ও আইনগত সহযোগিতা চেয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলো। প্রশাসন জানিয়ে দিল—অসুস্থ মাকে দেখতে প্যারোল দেওয়ার বিধান নেই। মানুষটি মারা গেলে তখন নাকি কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলের বিধান আছে।

কী অসাধারণ রাষ্ট্রীয় যুক্তি!

মা যতক্ষণ বেঁচে আছেন, ছেলে তাঁকে দেখতে পারবে না। মা মারা গেলে মৃতদেহ দেখতে যেতে পারে।

আইনের উদ্দেশ্য কি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, নাকি মানুষকে অপমান করার জন্য আইনের অক্ষরকে ঢাল বানানো?

পরদিন সকালেই সন্ধ্যা রাণী ধর মারা গেলেন। যে ছেলেকে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, তাকে আর দেখতে পেলেন না।

এই জায়গায় আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি প্রশ্ন করতে চাই।

আপনি কয়েক দিন আগেও জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে বলেছেন, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, সবাই বাংলাদেশি। বলেছেন ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার। এর আগেও বলেছেন আপনার সরকার ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করবে না এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার পাবে। চমৎকার কথা।

কিন্তু একজন হিন্দু ধর্মীয় নেতার মা যখন মৃত্যুশয্যায় তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চান, তখন আপনার সেই “সমান অধিকার” কোথায় যায়?

বক্তৃতামঞ্চে হিন্দুদের সামনে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতির কথা বলা সহজ। জন্মাষ্টমীতে শুভেচ্ছা দেওয়া সহজ। “আমরা সবাই বাংলাদেশি” বলা আরও সহজ। রাষ্ট্রের মানবিকতার পরীক্ষা হয় তখনই, যখন সেই কথার মূল্য দেওয়ার সময় আসে।

সন্ধ্যা রাণী ধরের মৃত্যুশয্যা ছিল আপনার সরকারের সেই পরীক্ষা।

আপনার সরকার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।

আমি জানি, প্রধানমন্ত্রী আদালত নন। তারেক রহমান কোনো বিচারককে ফোন করে বলতে পারেন না—চিন্ময়কে ছেড়ে দিন। তাঁকে তা করতেও বলা হচ্ছে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকতেই হবে।

কিন্তু এই যুক্তির আড়ালে সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব লুকিয়ে ফেলা যাবে না।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বন্দি রাখা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে—সেগুলোর বিচার হোক। তিনি অপরাধী হলে আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি দিক। কিন্তু অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ এক জিনিস নয়। একজন অভিযুক্ত মানুষকে বছরের পর বছর এমনভাবে বন্দি রাখা, যেন অভিযোগ উত্থাপিত হওয়াই অপরাধ প্রমাণের সমান—এটি ন্যায়বিচারের ধারণা নয়।

বিশেষ করে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুতর। হাইকোর্টের নিজের রায়েই বলা হয়েছে, অভিযোগে বর্ণিত ঘটনা দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারার রাষ্ট্রদ্রোহের মধ্যে পড়ে না। আদালত তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল এবং চিন্ময়কে জামিন দিয়েছিল। তারপর রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিন আটকে দেওয়ার জন্য উচ্চ আদালতে গেছে।

এই মামলাগুলোর শুরু তারেক রহমানের সরকারের সময় নয়—এ কথাও সত্য। কিন্তু ক্ষমতায় এসে অন্যায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় সেটি সংশোধন করার দায়িত্ব।

তারেক সরকার ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায়। এপ্রিলেই তাঁর সংস্কৃতিমন্ত্রী প্রকাশ্যে চিন্ময়ের মুক্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশ্বাস কোথায় গেল?

সরকার অন্তত দেখতে পারত রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান ন্যায়সংগত কি না। মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল কি না, তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে পারত। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের সঙ্গে বন্দি সন্তানের দেখা করানোর কোনো আইনসম্মত মানবিক ব্যবস্থা আছে কি না, সর্বোচ্চ পর্যায়ে তা খুঁজে দেখতে পারত।

কিছুই করা হলো না।

বরং প্রশাসন এমন এক নিষ্ঠুর বাক্য উচ্চারণ করল যার সারকথা—মরে গেলে দেখা যাবে, বেঁচে থাকতে নয়।

এর নাম প্রশাসন হতে পারে; মানবিকতা নয়।

আর এই ঘটনার ধর্মীয় দিকটিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আমি প্রমাণ ছাড়া বলব না যে তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে হিন্দুবিদ্বেষী। কিন্তু আমি অবশ্যই প্রশ্ন করব: বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু নেতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এই আচরণ যদি ঘটে, তাহলে দেশের সাধারণ হিন্দু নাগরিক কোন বার্তা পায়?

তারা কি বিশ্বাস করবে, রাষ্ট্র সত্যিই তাদেরও সমানভাবে নিজের নাগরিক মনে করে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলে সব নাগরিক আইনের চোখে সমান। ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্মের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। ১২ অনুচ্ছেদ সাম্প্রদায়িকতা এবং কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও নিপীড়ন দূর করার কথা বলে।

সংবিধানের এই কথাগুলো শুধু বইয়ের পাতায় থাকার জন্য নয়।

তারেক রহমান, আপনি প্রায়ই “বৈষম্যহীন বাংলাদেশ”-এর কথা বলেন। তাহলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আচরণের ব্যাখ্যা দিন।

কেন আপনার সরকারের একজন মন্ত্রী এপ্রিল মাসে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েও কিছু করতে পারলেন না?

কেন একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের আবেদন রাষ্ট্রের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাল না?

কেন ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মানবিক সহযোগিতা চেয়ে স্মারকলিপি পৌঁছানোর পরও এমন কোনো জরুরি উদ্যোগ চোখে পড়ল না, যাতে মা অন্তত জীবিত অবস্থায় ছেলেকে দেখতে পান?

আজ আর সন্ধ্যা রাণী ধরের জন্য কিছু করার নেই।

রাষ্ট্র এখন চাইলে চিন্ময়কে মায়ের মৃতদেহের সামনে নিয়ে যেতে পারে। নিয়মের খাতা খুলে বলতে পারে—এবার প্যারোলের বিধান আছে।

কিন্তু জীবিত মায়ের চোখ আর খুলবে না।

তিনি আর ছেলেকে দেখবেন না।

ছেলেও আর মাকে বলতে পারবে না—মা, আমি এসেছি।

এই অপূরণীয় মুহূর্তটির দায় কোনো সরকারি ফাইলের নিচে চাপা দেওয়া যাবে না। আদালতের স্বাধীনতার কথা বলে, বিধির কথা বলে, আমলাতান্ত্রিক নিয়মের কথা বলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার নৈতিক দায়িত্ব থেকে পালাতে পারে না।

একটি সরকার কতটা সভ্য, তার পরীক্ষা শুধু নির্বাচন, জিডিপি অথবা বক্তৃতায় হয় না। পরীক্ষা হয় রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের সঙ্গে কী আচরণ করে, তার মধ্যে।

সন্ধ্যা রাণী ধর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা চাননি।

তিনি তাঁর সন্তানকে চেয়েছিলেন।

তারেক রহমানের বাংলাদেশ তাঁকে সেই সন্তানটিকেও শেষবারের মতো দেখতে দিল না।

এই ব্যর্থতা শুধু একটি প্রশাসনের নয়।

এটি তারেক রহমান সরকারের নৈতিক ব্যর্থতা।

এবং একজন মায়ের শেষ ইচ্ছা অপূর্ণ রেখে যে রাষ্ট্র স্বস্তিতে ঘুমোয়, তাকে “বৈষম্যহীন” বা “মানবিক” রাষ্ট্র বলার আগে আমাদের অন্তত একবার লজ্জা পাওয়া উচিত।”