Supreme Court on UGC: মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে বৈষম্য? সমাধান অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতেই, পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে (Muslim Personal Law) মহিলাদের উত্তরাধিকার অধিকারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার শুনানিতে আদালত জানায়, এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেবল আদালতের হস্তক্ষেপে নয়, বরং আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সেই প্রসঙ্গেই প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “The answer is Uniform Civil Code”, অর্থাৎ এই ধরনের বৈষম্যের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোডেই।
মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি হয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি আর. মহাদেবনের বেঞ্চে। আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।
মামলার প্রেক্ষাপট?
মামলায় মুসলিম পার্সোনাল ল-এর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, মুসলিম মহিলারা সম্পত্তির ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান অধিকার পান না। বহু ক্ষেত্রে পুরুষেরা যে অংশ পান, মহিলারা তার অর্ধেক পান। ফলে এটি সংবিধানের সমতার নীতির পরিপন্থী।
প্রশান্ত ভূষণ আদালতে যুক্তি দেন, উত্তরাধিকার একটি নাগরিক অধিকার এবং এটি কোনও “essential religious practice” বা ধর্মীয় মৌলিক অনুশীলনের মধ্যে পড়ে না। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতার আড়ালে এই ধরনের বৈষম্য বজায় রাখা যায় না। তাঁর বক্তব্য, শায়রা বানো মামলায় ট্রিপল তালাক অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। সেই যুক্তিতেই মুসলিম মহিলাদেরও উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান অধিকার পাওয়া উচিত।
আদালতের প্রশ্ন, শরিয়ত আইন বাতিল হলে কী হবে?
শুনানির সময় আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। যদি ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট বাতিল করা হয়, তবে তার জায়গায় কোন আইন কার্যকর হবে?
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “আপনারা ১৯৩৭ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করছেন। কিন্তু সেটি যদি সরে যায়, তা হলে কোন আইন প্রযোজ্য হবে? আইনি শূন্যতা তৈরি হবে না?”
এর জবাবে প্রশান্ত ভূষণ বলেন, সে ক্ষেত্রে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন বা Indian Succession Act প্রযোজ্য হতে পারে। আদালত চাইলে ঘোষণা করতে পারে যে মুসলিম মহিলারাও উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষদের সমান অধিকারী।
‘অতিরিক্ত সংস্কারের তাড়ায় উল্টো ফল হতে পারে’
তবে এই প্রস্তাবে সতর্ক অবস্থান নেয় সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, শুধুমাত্র সংস্কারের তাগিদে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলে উল্টো ফলও হতে পারে।
তিনি বলেন, ১৯৩৭ সালের আইন বাতিল হলে তার পরবর্তী আইনি কাঠামো কী হবে, তা স্পষ্ট না থাকলে মহিলাদের অধিকার আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয় যাতে বর্তমানে যে অধিকার মহিলারা পাচ্ছেন, তার থেকেও কম পেয়ে যান।
বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণ, বিষয়টি আইনসভার
শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘এই ধরনের বিষয়ে আদালতের চেয়ে আইনসভাই বেশি উপযুক্ত ক্ষেত্র। কারণ সংসদের হাতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত আইন বাতিল করে আইনি শূন্যতা তৈরি করার বদলে বিষয়টি আইনসভার বিবেচনার উপর ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়, যাতে তারা প্রয়োজনে ইউনিফর্ম সিভিল কোড আনতে পারে।’
এরপরই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, “The answer, as correctly said, is the Uniform Civil Code।”
ব্যক্তিগত আইন বনাম সংবিধান
শুনানির সময় বেঞ্চ আর একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তোলে, ব্যক্তিগত আইন আদৌ সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরীক্ষায় পড়তে পারে কি না। বিচারপতি বাগচী এই প্রসঙ্গে বোম্বে হাইকোর্টের Narasu Appa Mali রায়ের উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল ব্যক্তিগত আইনকে সরাসরি মৌলিক অধিকারের পরীক্ষায় ফেলা যায় না।
তবে আবেদনকারীদের পক্ষ যুক্তি দেয়, এখানে শুধুমাত্র অলিখিত ব্যক্তিগত আইন নয়, Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937 নামে একটি আইনি কাঠামোও রয়েছে। ফলে সংবিধানসম্মততার প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়।
আদালতের পরামর্শ
শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এই মুহূর্তে কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি। আদালত আবেদনকারীদের পিটিশন সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছে। শুধু আইনকে চ্যালেঞ্জ করলেই হবে না, আইন বাতিল হলে বিকল্প আইনি কাঠামো কী হবে তাও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আবেদনটি সংশোধন করে বিকল্প প্রস্তাব দিতে হবে, যাতে বিষয়টি আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিবেচনা করা যায়। আদালতের মতে, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যদি দেশের কোনও অংশের মহিলারা তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তবে সেই অধিকার নিশ্চিত করা।
বৃহত্তর সাংবিধানিক বিতর্ক
এই মামলা শুধুমাত্র মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর সাংবিধানিক বিতর্ক—ব্যক্তিগত আইন বনাম সমতার অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম নাগরিক অধিকার এবং আদালত বনাম আইনসভার ভূমিকা।
ভারতের সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির অনুচ্ছেদ ৪৪-এ অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা বলা থাকলেও স্বাধীনতার এত বছর পরেও তা সারা দেশে কার্যকর হয়নি। মঙ্গলবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য সেই বিতর্ককে আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এল।


