১ ডলার = ৯১.৯৭ রুপি, সর্বকালীন রেকর্ড পতন ভারতীয় রুপির
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: বৃহস্পতিবার মার্কিন ডলারের বিরুদ্ধে সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেল ভারতীয় মুদ্রা। বিদেশি পুঁজির দুর্বল প্রবাহ এবং ডলার হেজিংয়ের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় প্রবল চাপের মুখে পড়ে রুপি। শক্তিশালী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তথ্য থাকা সত্ত্বেও বাজারে তার কোনও ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
দিনের লেনদেনে এক পর্যায়ে ডলারের তুলনায় রুপি নেমে আসে ৯১.৯৮৫০ স্তরে। এর ফলে গত সপ্তাহে তৈরি হওয়া আগের সর্বনিম্ন রেকর্ড ৯১.৯৬৫০ ভেঙে যায়। বাজার সূত্রের দাবি, এই প্রথম রুপি কার্যত ৯২-এর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেল।
চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত রুপির দর কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে পতনের গতি আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের পণ্য রফতানির উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করার পর থেকে ডলারের তুলনায় রুপির দর প্রায় ৫ শতাংশ নেমে গেছে।
এই পতন এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার যথেষ্ট শক্তিশালী। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি হয়েছে ৮.২ শতাংশ। তবুও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত চাপ এবং বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহার সেই ইতিবাচক তথ্যকে কার্যত ঢেকে দিয়েছে।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার স্থানীয় বাজার খোলার আগেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল রুপির পতনের গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা, বিশেষ করে যখন মুদ্রা দ্রুত ৯২ স্তরের দিকে এগোচ্ছিল। এক বিদেশি ব্যাঙ্কের ট্রেডারের বক্তব্য, আরবিআই কোনও নির্দিষ্ট স্তর রক্ষা করার বদলে হঠাৎ বড় ওঠানামা ঠেকাতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি সেশনে রুপির দুর্বলতা স্পষ্ট। মাত্র ছ’টি লেনদেনের দিনের মধ্যেই প্রথমবার ৯১-এর গণ্ডি পেরিয়ে প্রায় ৯২ ছুঁয়েছে রুপি। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বারবার জানিয়েছে, তারা মুদ্রার কোনও নির্দিষ্ট দর বা সীমা লক্ষ্য করে না। শুধুমাত্র অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করাই তাদের লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে রুপির উপর চাপ বাড়িয়েছে। আমেরিকার উচ্চ শুল্ক, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের অর্থ প্রত্যাহার, সোনা ও মূল্যবান ধাতুর আমদানি বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে রুপির আরও দুর্বলতা নিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলির আশঙ্কা—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ভারত এখনও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি এবং সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও মার্কিন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইউরোর তুলনায় রুপি প্রায় ৭.৫ শতাংশ এবং চিনা ইউয়ানের তুলনায়ও সমান হারে দুর্বল হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, দীর্ঘমেয়াদে ভারতের উপর আমেরিকার উচ্চ শুল্ক কমতে পারে। তবে সেই বিলম্ব আপাতত দেশের বৈদেশিক ভারসাম্যের উপর চাপ তৈরি করছে। তাঁদের মতে, আগামী ১২ মাসে ডলারের তুলনায় রুপির দর ৯৪ পর্যন্ত নামতে পারে।
এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার ডলারের তুলনায় ৯১ টাকার সীমা অতিক্রম করেছিল রুপি। মুদ্রা বিনিময় সংক্রান্ত একটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার এমডি অমিত পাবরির মতে, বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিদেশি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান চাপ ভারতীয় বাজারে ভীতির পরিবেশ তৈরি করছে। তাঁর কথায়, বাণিজ্য আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হলে দ্রুত বাজারে স্থায়িত্ব ফিরতে পারে। তবে আপাতত সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট নয়।


